ছবি: সংগৃহীত
দুই মিনিটের একটি বক্তব্য। আর সেই অল্প সময়ের মধ্যেই প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে উদ্দেশ করে প্রায় ৬০ বার ‘স্যার’ সম্বোধন। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায়ের এমন বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
কেউ এটিকে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত আনুগত্য প্রকাশের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, প্রশাসনের দীর্ঘদিনের আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা ধরনের মন্তব্য ও বিতর্ক।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার জামিয়া আরাবিয়া দারুল হাদিস ইমদাদুল উলুম লামনীগ্রাম মাদ্রাসায় প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে স্থানীয় সুধীজনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সদ্য যোগ দেওয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনন্দা রায়।
প্রায় দুই মিনিটের ওই বক্তব্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বাক্যের শুরুতে কিংবা শেষে তিনি মন্ত্রীকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেন। বক্তব্যটি দুই দিন পর, বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আজ শনিবারও ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজে ব্যাপকভাবে শেয়ার হতে থাকে। ভিডিওটি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে সৃষ্টি হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
অনেকেই মন্তব্য করেছেন, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্যে শালীনতা ও প্রোটোকল বজায় রাখা স্বাভাবিক বিষয় হলেও একই সম্বোধনের এত ঘন ঘন ব্যবহার প্রয়োজনীয়তার সীমা অতিক্রম করেছে। আবার অন্য একটি অংশের মত, সরকারি অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে সম্মানসূচক সম্বোধন করা প্রশাসনিক রীতির অংশ। তাই বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে দেখার সুযোগ নেই।
এই ঘটনাই অবশ্য প্রথম নয়। এর আগে গত ২৪ মার্চ রংপুরে একটি আলোচনা সভায় দুই মিনিটের বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুকে উদ্দেশ করে প্রায় ৬০ বার ‘স্যার’ সম্বোধন করেছিলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এনামুল আহসান। সেই ভিডিওও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বারবার ‘স্যার’ বলার আরও কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
জৈন্তাপুরের সভায় সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. জাবের সাদেক, সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) সহকারী পরিচালক মুহীদুল ইসলামসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফেসবুক ব্যবহারকারী রেজাউল করিম নামের একজন লিখেছেন, “সম্মান দেখানো আর অতিরিক্ত তোষামোদের মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যে সেই ভারসাম্য থাকা উচিত।”
অন্যদিকে তানিয়া রহমান নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, “সরকারি অনুষ্ঠানে কর্মকর্তারা অনেক সময় প্রোটোকল মেনে কথা বলেন। ভিডিওর একটি অংশ দেখে পুরো বিষয়টি বিচার করা ঠিক হবে না।”
আবদুল্লাহ আল মামুন নামে একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “এভাবে বারবার ‘স্যার’ বলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন কর্মকর্তা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, কোনো ব্যক্তির নয়।”
আবার সুমাইয়া ইসলাম নামে আরেকজন লিখেছেন, “সম্ভবত নার্ভাসনেস থেকেও এমন হতে পারে। তাই ব্যক্তিগতভাবে কাউকে হেয় না করে প্রশাসনিক যোগাযোগের ধরন নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।”
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষা, আচরণ ও উপস্থাপনায় পেশাদারত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক প্রোটোকল মেনে সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে না দেখা যায়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মাহবুব রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিক ব্যক্তি নন; তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী এবং জনগণের সেবক। তাই তাদের বক্তব্যে শালীনতা ও সম্মান থাকবে, কিন্তু একই সম্বোধনের অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি অনেক সময় ভিন্ন বার্তা দেয়। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের প্রশাসনে ঔপনিবেশিক আমল থেকে একটি অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি রয়ে গেছে। সেই সংস্কৃতিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অতিমাত্রায় সম্মানসূচক ভাষায় সম্বোধনের প্রবণতা দেখা যায়। আধুনিক জনপ্রশাসনে অবশ্য সংক্ষিপ্ত, আত্মবিশ্বাসী ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তারা বলেন, একজন কর্মকর্তা যখন বক্তব্য দেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত পরিচয়ে নয়, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলেন। ফলে তার ভাষা ও উপস্থাপনায় এমন ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন, যাতে সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।
প্রশাসনের সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, তার মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে যোগাযোগ দক্ষতার ওপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, অনেক সময় বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাসের অভাব কিংবা অতিরিক্ত সতর্কতা থেকেও একই ধরনের সম্বোধন বারবার ব্যবহার করা হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এমন বিষয় দ্রুত আলোচনায় চলে আসে। ফলে কর্মকর্তাদের জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি নতুন করে সরকারি প্রশাসনের ভাষা, প্রোটোকল এবং পেশাদারত্ব নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে নিছক সৌজন্য বলছেন, কেউ দেখছেন অতিরিক্ত তোষামোদের প্রকাশ হিসেবে। তবে মতপার্থক্য থাকলেও অধিকাংশের মত, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খবরটি শেয়ার করুন