ছবি: সংগৃহীত
দেশের রাজনীতিতে বহু সময় একটি নথি, একটি স্বাক্ষর কিংবা একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক বিষয় হয়ে থাকে না; তা রাজনৈতিক প্রতীকেও রূপ নেয়। স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি প্রকল্প ফাইলকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন শুধু একটি ফাইল অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি পরিণত হয়েছে জবাবদিহি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সাবেক বিতর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের উত্তরাধিকার এবং রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের বৃহত্তর প্রশ্নে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল শনিবার অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সচিবের স্বাক্ষর ছাড়াই একটি প্রকল্প ফাইল অনুমোদন করেছিলেন। তার ভাষায়, এটি রুলস অব প্রসিডিওর এবং রুলস অব বিজনেসের পরিপন্থী। শনিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই তথ্য জানান।
এই অভিযোগ তিনি এমন এক সময়ে তুললেন, যখন স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এর অধীন দপ্তর–সংস্থাগুলোর আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অনিয়ম–দুর্নীতি তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই তদন্তের সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে ৬০ কর্মদিবস।
প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগের জবাবে সেই নির্দিষ্ট ফাইল প্রকাশের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও ‘চ্যালেঞ্জ’ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যদি সৎ সাহস থাকে, তাহলে আগামীকাল রোববারের (আজ) মধ্যে ফাইলটা জনগণের সামনে উত্থাপন করবেন।’
শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অভিযোগ তোলার পর সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে এসে এ ব্যাপারে কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন।
আসিফ মাহমুদ শুধু অভিযোগ অস্বীকার করেই থেমে থাকেননি। তিনি সরাসরি পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তার বক্তব্য, সচিবের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো ফাইল উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর টেবিলে আসাই সম্ভব নয়। যদি এমন কোনো ফাইল থাকে, তাহলে সেটি জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক। দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ফাইলের যাত্রাপথ সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই অদৃশ্য।
কিন্তু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে ফাইলের চলাচল বহুস্তরীয়। সাধারণত নিচের স্তর থেকে শুরু হয়ে উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সচিবের পর্যায় অতিক্রম করে তা মন্ত্রী বা উপদেষ্টার কাছে যায়। ফলে আসিফ মাহমুদের বক্তব্য—“সচিবকে না জানিয়ে কোনো প্রকল্প অনুমোদন অসম্ভব”—আংশিকভাবে প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করেন সাবেক আমলারা।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিমন্ত্রী যদি এত নির্দিষ্ট অভিযোগ করেন, তাহলে ফাইলটির প্রকৃতি কী? প্রকল্পটি কোন খাতের? কত অর্থের? সচিব অনুপস্থিত ছিলেন কি না? তার স্থলাভিষিক্ত কর্মকর্তা কে ছিলেন? অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নথিটি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময় নির্বাচন। কারণ, স্থানীয় সরকার বিভাগে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণার মধ্যেই এই অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি তদন্তের অংশ, নাকি রাজনৈতিক বক্তব্য?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, দেশে প্রায়ই দেখা গেছে যে তদন্ত ও রাজনৈতিক বক্তব্য একই সময় সামনে আসে, যার ফলে প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
এর আগেও বিভিন্ন মহল থেকে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ছাত্রসংগঠন তার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
রাজনীতিতে অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসব অভিযোগকে আরও দ্রুত এবং তীব্রভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আসিফ–শাহে আলম বিতর্কেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্সে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
রাজশাহীর ব্যবসায়ী তানভীর সাদিক লিখেছেন, “ফাইল থাকলে প্রকাশ করুন। অভিযোগ করলেন, আবার বললেন তদন্তে বের হবে—এটা মানুষের সন্দেহ বাড়ায়।” চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান লিখেছেন, “বাংলাদেশে সমস্যা হলো, সবাই অভিযোগ দেয় কিন্তু পরে আর কিছু শোনা যায় না। জনগণ এখন ডকুমেন্ট দেখতে চায়।”
খুলনার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম খান মন্তব্য করেছেন, “যদি নিয়ম ভেঙে থাকে, তাহলে বিচার হবে। কিন্তু অভিযোগেরও তো দায় আছে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহবুব রেজা মনে করেন, “এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। একটি হলো প্রশাসনিক নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে কি না। আরেকটি হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না। কোনো অভিযোগ যদি নথিভিত্তিক হয়, তাহলে নথি প্রকাশ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।”
তবে সবাই একইভাবে দেখছেন না। অনেকে মনে করছেন, এই বিতর্কের ভেতরে আরও বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। ঢাকার বাসিন্দা রাশেদ কবির লিখেছেন, “জুলাই–পরবর্তী রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব ও পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, এই ঘটনা তার অংশ হতে পারে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াগুলো দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—মানুষ এখন বক্তব্যের চেয়ে দলিলকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। একসময় রাজনৈতিক বক্তৃতা জনমত গঠনে যথেষ্ট ছিল। এখন মানুষ স্ক্রিনশট, নথি, কাগজ, ব্যাংক হিসাব, ভিডিও—সবকিছু দেখতে চায়।
এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী পিরোজপুরের একটি প্রকল্পের উদাহরণ তুলে বলেছেন, টেন্ডারের পর কাজ না করেই কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং এ কারণে উন্নয়ন প্রকল্প থমকে গেছে। যদি এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে তা কেবল একটি জেলা নয়, বৃহত্তর উন্নয়ন কাঠামোর জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
দেশের উন্নয়ন রাজনীতিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বরাবরই বড় বাজেটের একটি খাত। রাস্তা, সেতু, পৌর অবকাঠামো, গ্রামীণ উন্নয়ন—সবকিছুর সঙ্গে এই মন্ত্রণালয়ের সংযোগ রয়েছে। ফলে এখানকার প্রতিটি প্রকল্প, প্রতিটি ফাইল এবং প্রতিটি অনুমোদনের আর্থিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। এখন মূল প্রশ্ন একটি—মীর শাহে আলম কি সেই নির্দিষ্ট ফাইল প্রকাশ করবেন?
যদি করেন, তাহলে বিতর্কের একটি বাস্তব ভিত্তি সামনে আসবে। যদি না করেন, তাহলে আসিফ মাহমুদের দাবি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে যে তাকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা হয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিযোগ প্রায়ই দ্রুত আসে, কিন্তু তার নিষ্পত্তি দীর্ঘ হয়। ফলে এই বিতর্কও হয়তো সাময়িক উত্তাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের আগ্রহ থাকবে একটি জায়গায়—ফাইলটি কোথায়? কারণ, এই মুহূর্তে রাজনীতির চেয়ে বেশি কথা বলছে একটি অনুপস্থিত নথি। আর সেই নথির অপেক্ষাতেই আছে জনপরিসর।
খবরটি শেয়ার করুন