ছবি: সংগৃহীত
বরিশালে মাদকসহ গ্রেপ্তার এক ব্যক্তির ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সম্পাদনা করে আর্জেন্টিনার জার্সির পরিবর্তে ব্রাজিলের জার্সি পরিয়ে সংবাদমাধ্যমে পাঠানোর ঘটনায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) উপপরিদর্শক (এসআই) তানজিল আহমেদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইতোমধ্যে তাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং বিএমপির মিডিয়া সেল ও সাংবাদিকদের জন্য পরিচালিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আশিক সাঈদ মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে মঙ্গলবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অভিযুক্ত এসআই তানজিল আহমেদকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। তার জবাব পাওয়ার পর বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে নগরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদপুর কলোনি এলাকায় কাউনিয়া থানা-পুলিশ একটি অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে ৮০০টি ইয়াবাসহ রাসেল হাওলাদার (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাসেল ওই এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারিদের একজন।
গ্রেপ্তারের পর নিয়ম অনুযায়ী তার ছবি তোলা হয় এবং সেই ছবি পরবর্তী সংবাদ বিজ্ঞপ্তির জন্য বিএমপির মিডিয়া সেলে পাঠানো হয়। তবে সেখানেই ঘটে বিতর্কের সূত্রপাত।
কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সনজীত চন্দ্র নাথ জানান, ‘গ্রেপ্তারের সময় রাসেলের গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি ছিল। পরে ছবি তোলার সময় নিয়ম অনুযায়ী তার জার্সিটি উল্টো করে পরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সেই ছবি বিএমপির মিডিয়া সেলে পাঠানো হয়েছিল।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ছবিটি হাতে পাওয়ার পর মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা এসআই তানজিল আহমেদ সেটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ছবিতে থাকা আর্জেন্টিনার জার্সির নকশা পরিবর্তন করে সেটিকে ব্রাজিল দলের জার্সির আদলে রূপ দেন। এরপর পরিবর্তিত ছবিটিই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে ই-মেইলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে বিএমপির সাংবাদিকদের জন্য পরিচালিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও সেটি শেয়ার করা হয়।
পরবর্তীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই মূল ছবি ও সম্পাদিত ছবির পার্থক্য তুলে ধরে প্রশ্ন তোলেন, একটি সরকারি সংস্থার প্রকাশিত ছবিতে এ ধরনের ডিজিটাল পরিবর্তন কীভাবে করা হলো। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকলে কয়েকজন সাংবাদিক পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এরপর তাৎক্ষণিকভাবে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়েই ছবি সম্পাদনার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বিকৃত ছবিটি প্রত্যাহার করা হয়। পরে প্রকৃত ছবি সংযুক্ত করে নতুন করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়।
পুলিশ কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত এসআই তানজিল আহমেদ ছবি পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটবল নিয়ে দুই দলের সমর্থকদের উন্মাদনা ও আগ্রহের কথা বিবেচনায় নিয়ে তিনি কৌতূহলবশত এটি করেছেন। তবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এটি ‘গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ’। এ কারণে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শোকজ করা হয়েছে। ব্যাখ্যা পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রকাশিত ছবি যদি বিনোদনের উদ্দেশ্যে বা ব্যক্তিগত আগ্রহে পরিবর্তন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি তথ্য ও আলামতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহির রহমান লিখেছেন, “মাদক মামলার সংবাদে অভিযুক্তের জার্সি কোন দলের, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সরকারি নথি বা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত ছবিতে এআই দিয়ে পরিবর্তন করা অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।” নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “আজ জার্সি বদলানো হয়েছে, কাল অন্য কিছু বদলে দিলে মানুষ কীভাবে সরকারি ছবির ওপর আস্থা রাখবে? প্রযুক্তি ব্যবহারেরও নৈতিক সীমা থাকা উচিত।”
রাফি হাসান নামে এক নেটিজেন লিখেছেন, “ফুটবল সমর্থন ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করার সময় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কোনো জায়গা নেই। পুলিশের প্রকাশিত ছবি বাস্তবতার প্রতিফলন হওয়া উচিত।” তবে কয়েকজন ভিন্ন মতও দিয়েছেন। সিয়াম কবির মন্তব্য করেন, “হয়তো এটি নিছক কৌতূহল বা অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু যেহেতু এটি সরকারি যোগাযোগের অংশ, তাই এর জন্য জবাবদিহি অবশ্যই থাকা উচিত।”
আরিফা ইসলাম লিখেছেন, “এআই এখন অনেক শক্তিশালী প্রযুক্তি। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।” প্রযুক্তি-সচেতন অনেক ব্যবহারকারীও মন্তব্য করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ছবি সম্পাদনাকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ করে দিয়েছে। তবে সংবাদ, আইন প্রয়োগ বা বিচার-সংশ্লিষ্ট নথিতে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তা অবশ্যই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাগত নৈতিকতার মানদণ্ড মেনে হতে হবে। অন্যথায় তথ্যের সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
ঘটনাটি নিয়ে বরিশালজুড়ে আলোচনার পাশাপাশি সাংবাদিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, গণমাধ্যমে পাঠানো সরকারি ছবি সম্পাদনা করা হলে সংবাদ পরিবেশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে এমন ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ইতিবাচক হলেও ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য আরও কঠোর তদারকি ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
বর্তমানে অভিযুক্ত এসআই তানজিল আহমেদের লিখিত ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছে বিএমপি। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তার জবাব পাওয়ার পর বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ।
খবরটি শেয়ার করুন