ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে হওয়ার কথা। বৈঠকটি ঘিরে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে হঠাৎ করে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতার সঙ্গে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত যোগাযোগ করে সুখবর ডটকম জানতে পেরেছে, বৈঠকটি নির্ধারিত সময়েই হওয়ার কথা রয়েছে। তারা বৈঠক বাতিল বা পিছিয়ে যাওয়ার খবরকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকটি এক দিন আগে হঠাৎ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কেন তা করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈঠকটি প্রথমে কলকাতায় করার পরিকল্পনা ছিল। পরে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত কারণে স্থান পরিবর্তন করে নয়াদিল্লি করা হয়। বৈঠকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। নর্থইস্ট নিউজ এর আগে আওয়ামী লীগের অন্তত দুই নেতার সঙ্গে কথা বলে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছিল।
তবে এই প্রতিবেদনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভারতে অবস্থানরত কয়েক নেতার বক্তব্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। সুখবর ডটকমের সঙ্গে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত যোগাযোগ করা আওয়ামী লীগের অন্তত ছয়জন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা বলেছেন, ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠক পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ীই হওয়ার কথা রয়েছে। তাদের কেউ বৈঠক বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করেননি।
নেতাদের কয়েকজন বলেন, বৈঠক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য ছড়িয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর। তাদের ভাষ্য, বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে এবং ভারতে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট নেতাদের মধ্যে এ নিয়ে আলাদা কোনো বাতিলের বার্তা দেওয়া হয়নি।
বৈঠক বাতিলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম সম্পাদিত ওয়াদার অনলাইনের মাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গুঞ্জনটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। পরে ভারতীয় নর্থইস্ট নিউজও বৈঠকটি বাতিল বা পিছিয়ে যাওয়ার দাবি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তবে নর্থইস্ট নিউজের এই দাবির বাইরে বৃহস্পতিবার রাতে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্যে বৈঠক বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বরং তারা বৈঠক হওয়ার কথাই জানিয়েছেন। ফলে এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। একটি পক্ষ বলছে, বৈঠকটি বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা বলছেন, বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বৈঠক বাতিলের বিষয়ে ব্যাপক কোনো প্রতিবেদন দেখা যায়নি। নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনটি মূলত এ বিষয়ে প্রকাশিত আলোচিত প্রতিবেদনগুলোর একটি। বাংলাদেশি কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমও পরে নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বৈঠক বাতিলের খবর প্রকাশ করেছে।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর নর্থইস্ট নিউজ নিজস্ব সূত্রের বরাতে জানিয়েছিল, ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ২৩ জন জ্যেষ্ঠ নেতার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরাই বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হতে পারে।
বাংলাদেশি ও ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও গত কয়েক দিনে বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ২১ জন নেতা বৈঠকে অংশ নেবেন। কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলেরও উপস্থিত থাকার কথা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াও এর আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের মতবিনিময়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন সুখবর ডটকমকে। তার বক্তব্য ছিল, শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। আলোচনার নির্দিষ্ট কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
এই বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনা ঘিরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতেই অবস্থান করছেন। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নেতাদের সঙ্গে এ সময়ের মধ্যে এটি বড় পরিসরের সরাসরি বৈঠক হতে যাচ্ছে বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সাম্প্রতিক সময়ে নানা তথ্য দিয়েছেন। গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, গ্রেপ্তার, কারাবন্দী হওয়া কিংবা হত্যার আশঙ্কা থাকলেও তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। এরপর আওয়ামী লীগের কয়েক নেতার বক্তব্যের বরাতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিক বা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে তার ফেরার একটি পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ফেরার পথ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ভারতের পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের একটি পরিকল্পনার কথা আগে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আকাশপথে ফেরার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা জানিয়েছেন। তবে এসব বিষয়ে বাংলাদেশ বা ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান এর আগে সুখবর ডটকমকে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার বিমান ও সড়ক—দুই পথেই ফেরার প্রস্তুতি রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টির সঙ্গে কৌশলগত ও নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও বলেছিলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সঙ্গে কৌশলগত অনেক বিষয় জড়িত এবং সব পরিকল্পনা এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে এসব বিষয় নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার আলোচনা হতে পারে। সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস নিয়েও কথা হতে পারে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যারা দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন, গ্রেপ্তার, মামলা বা অন্য ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন, তাদের সাংগঠনিক গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা নেতাদের নিয়েও আলোচনা হতে পারে। দলীয় পদকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন, নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন আশ্বাস দেওয়া এবং পরে তাদের পাশে না থাকার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে কয়েক নেতা জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি সহযোগী সংগঠনের কিছু পদে পরিবর্তনের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাদের কর্মকাণ্ড এবং দলীয় কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা দাবি করেছেন।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলে দলের নেতৃত্ব কীভাবে চলবে, সেই প্রশ্নও আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনায় রয়েছে। তিনি অনুপস্থিত থাকলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে কে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সঙ্গে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনগত বিষয়ও জড়িত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। শেখ হাসিনা ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন। ফলে দেশে ফেরার যেকোনো পরিকল্পনার সঙ্গে আইনগত ও নিরাপত্তার বিষয় যুক্ত রয়েছে।
এ অবস্থায় ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকটি আদৌ বাতিল হয়েছে কি না, তা নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে। নর্থইস্ট নিউজ বৈঠক বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে। বাংলাদেশি কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমও সেই খবর প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে সুখবর ডটকমের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অন্তত ছয়জন শীর্ষ নেতা বৈঠকটি বাতিল হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর পূর্বনির্ধারিত বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ফলে বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। বৈঠক হওয়ার পরই এ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। তার আগে বাতিল বা পিছিয়ে যাওয়ার খবরকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বৈঠক বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
খবরটি শেয়ার করুন