ছবি: সংগৃহীত
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া গ্রামে গত তিন বছরে অন্তত শতাধিক বিদেশি পর্যটক এসেছেন। তারা উপভোগ করছেন গ্রামের ধানখেত, পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা, কাদামাটিতে ছেলেদের ফুটবল নিয়ে মত্ত হওয়া, মেঠোপথে হাঁটাহাঁটি, ক্যারাম খেলাসহ গ্রামীণ জীবনের নানা অনুষঙ্গ।
এসব দৃশ্য বিদেশিদের কাছে পরিচিত করে তুলছেন স্থানীয় যুবক জাফর তুহিন। ২০২২ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য। বিদেশিদের অনেকেই একাধিকবারও এসেছেন। বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ জীবনের স্বাদ নিতে আগ্রহীদের জন্যই কাজ করছেন তুহিন।
আজ শনিবার ব্রিটিশ দম্পতি টাজ ও লিব্বি একদুয়ারিয়া গ্রামে বেড়াতে এসে মিশে যান স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণ ভিডিও তৈরি ও ব্লগ লেখার জন্য পরিচিত এই দম্পতিকে সকালে দেখা যায় গ্রামের নানা কাজে অংশ নিতে।
লিব্বি ও টাজ গরুর দুধ দোহন, রুটি তৈরি, ডিম ভাজা, পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা, ক্যারাম খেলায় অংশ নেন। ভাষা না মিললেও স্থানীয়রা ইশারা-ইঙ্গিতে তাদের সঙ্গে মিশে যান, আর তারাও উপভোগ করেন গ্রামীণ জীবনের আনন্দগুলো।
বিকেলে ফসল কাটা ফাঁকা মাঠে ফুটবল খেলে সন্ধ্যায় পাড়ার চায়ের দোকানে আড্ডা দেন তারা। শুধু উপভোগই নয়, নিজেদের উচ্ছ্বসিত ভিডিও প্রকাশ করেন নিজেদের ভ্লগে। অতিথিদের থাকার জন্য তুহিন তার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ব্যবস্থা করেছেন।
দুইজন পর্যটকের জন্য চার রাত তিন দিনের থাকা-খাওয়া, গাইড ও অন্যান্য সুবিধাসহ প্যাকেজমূল্য হিসেবে তিনি ৪০০ ডলার নেন। পর্যটকেরা আরও গভীরভাবে গ্রামের সংস্কৃতি উপভোগ করতে চাইলে অতিরিক্ত ফি’র বিনিময়ে সেই সুযোগও রয়েছে।
লিব্বি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ খুবই অতিথিপরায়ণ। এলাকার মানুষ আমাদের স্বাভাবিকভাবে আপন করে নিয়েছে, যা খুব ভালো লেগেছে। তিন দিনেই আমি রুটি বানানো ও ডিম ভাজা শিখে গেছি।’
খাবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখানে খাবারে অনেক মসলা ব্যবহার করা হয়, তবে আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। দেশে ফিরে আমি আমার ভিডিওর মাধ্যমে বাংলাদেশ ভ্রমণে মানুষকে উৎসাহিত করব। কেননা এখানকার মানুষ খুবই ভালো।’
টাজ বলেন, ‘লুঙ্গি পরে মাছ ধরেছি, ধানখেতে গিয়েছি। এখানকার পরিবেশ সবুজ ও অত্যন্ত সুন্দর। আমরা আগে একবার এসেছিলাম, আবার সুযোগ পেলে আসব।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাফর তুহিনের বাবা নেই। মাকে নিয়ে একসময় ঢাকায় থাকতেন। ২০২০ সালে করোনা শুরু হলে শহর ছেড়ে তিনি একদুয়ারিয়ায় ফিরে আসেন। একসময় টাকা জমলেই বেরিয়ে পড়তেন ভ্রমণে। কখনো শ্রীমঙ্গল, কখনো বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে। একসময় ‘নিশিদল’ নামে ভ্রমণপিপাসুদের একটি দল গঠন করেন। তারা রাতের জীবন ও প্রকৃতি উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়তেন।
পরে কয়েটি আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁয় কাজ করার সময় এক মার্কিন পর্যটকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার মাধ্যমেই ‘কাউচসার্ফিং’ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হন তুহিন। এরপর বিদেশি পর্যটকদের আতিথ্য দেওয়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে।
শুরুর দিকে মাসে দুয়েকজন পর্যটক এলেও এখন সেই সংখ্যা অনেক বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা আসছেন। একদুয়ারিয়া গ্রাম এখন তার স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। বিদেশি পর্যটকদের কাছে গ্রামটির সৌন্দর্য তুলে ধরতে চান তিনি।
জাফর তুহিন মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ‘ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করতে গিয়ে থাইল্যান্ডে একটি ধানখেতের মাঝে আবাসিক হোটেল দেখেছিলাম, যার ব্যাপক চাহিদা ছিল। সেই ধারণা থেকেই আমি গ্রামে পর্যটকদের আমন্ত্রণ জানাই। করোনার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন, নিউজিল্যান্ডসহ ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া থেকে শতাধিক পর্যটক এসেছেন। দিন দিন সাড়া বাড়ছে।’
জাফর তুহিন বলেন, ‘ঢাকায় একবার শেকড় গজালে আর গ্রামে ফেরা কঠিন। অনেক চেষ্টা করে আমি ফিরেছি। এখন জীবনটাকে উপভোগ করতে চাই।’
খবরটি শেয়ার করুন