রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

‘তারেক রহমান কি আদৌ বাংলাদেশকে ভালোবাসেন, গণতন্ত্র ভালোবাসেন’

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৩:২০ পূর্বাহ্ন, ৪ঠা জুলাই ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

চ্যানেল আইয়ের টকশো টু দ্য পয়েন্ট-এর একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক সোমা ইসলামকে তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান এবং গণতন্ত্র বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। ভিডিওটি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গণমাধ্যমের ভূমিকা, টেলিভিশন টকশোগুলোর উপস্থাপনা, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং বর্তমান সময়ে সেই ভিডিও পুনরায় প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে নানা মতামত উঠে এসেছে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। ভিডিওতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ শাহজাহান ওমর। আলোচনার একপর্যায়ে সোমা ইসলাম তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তারেক রহমান কি আদৌ বাংলাদেশকে ভালোবাসেন, বা গণতন্ত্রকে ভালোবাসেন?’ একই সঙ্গে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং জানতে চান, দলের ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের কোনো দাবি রয়েছে কি না।

ভিডিওটির সুনির্দিষ্ট সম্প্রচার-তারিখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়নি। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায়, এটি ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচারিত হয়েছিল। কারণ, ভিডিওতে বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নেবে কি না—এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে, যা সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভিডিওতে দর্শকপ্রিয় ও আলোচিত উপস্থাপক সোমা ইসলাম বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান প্রসঙ্গে বলেন, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতাশ বলে তার মনে হচ্ছে এবং তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কার্যকর নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দলের প্রধান (তারেক রহমান) দেশের বাইরে অবস্থান করে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সভা করছেন এবং প্রায় প্রতিদিনই জনগণের কাছে ক্ষমা চাইছেন—এমন পরিস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শাহজাহান ওমরের মতামত জানতে চান।

ভিডিওটি নতুন করে আলোচনায় আসে দৈনিক আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আব্দুল্লাহ এবং আল–জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তাদের নিজ নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এটি শেয়ার করার পর। তাদের দেওয়া মন্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এম আব্দুল্লাহ ভিডিওটি শেয়ার করে লেখেন, ‘তারেক রহমান কি বাংলাদেশ ভালোবাসে, গণতন্ত্র ভালোবাসে? উপরের প্রশ্নটি আমার নয়, সোমাপুর।’ একই পোস্টে তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির নির্ধারিত সাক্ষাৎ না হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে সোমা ইসলামের উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় ধরে টেলিভিশনের কিছু টকশো সাবেক ক্ষমতাসীনদের (আওয়ামী লীগ) রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার ভূমিকা পালন করেছে।

অন্যদিকে জুলকারনাইন সায়েরও ভিডিওটি শেয়ার করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব নিয়ে মন্তব্য করেন। তার পোস্টে সোমা ইসলামের সাম্প্রতিক ভারত সফর এবং সেখানে কিছু ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠকের দাবি করা হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করেননি। সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ভিডিওটিতে আলোচনার সময় ২০১৩ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের প্রসঙ্গও আসে। সে সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের কারণে সেই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়নি। ওই সময় জামায়াত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ছিল। সেই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও অনুষ্ঠানে প্রশ্ন তোলেন সোমা ইসলাম।

যার সঙ্গে আলোচনাটি হচ্ছিল, সেই শাহজাহান ওমর পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তনের অংশ হন। দীর্ঘদিন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ঝালকাঠি-১ আসন থেকে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদল ব্যবহারকারী মনে করছেন, এটি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গণমাধ্যমের একটি অংশ কীভাবে বিরোধী দলকে উপস্থাপন করত, তার একটি উদাহরণ। তাদের মতে, সেই সময় টেলিভিশন টকশোগুলোতে বিরোধী দলের নেতাদের নিয়ে কঠোর, কখনো কখনো অসম বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্ন করা হতো।

অন্যদিকে আরেকটি অংশের মত হলো, একটি পুরোনো ভিডিও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে ছড়িয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট একজন সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু বানানোর চেষ্টা হচ্ছে। তাদের মতে, কোনো সাংবাদিকের অতীত উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, তবে সেটি যেন ব্যক্তি আক্রমণ বা প্রমাণহীন অভিযোগে রূপ না নেয়।

অনেকের ধারণা, উপস্থাপক সোমা ইসলাম ওই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে নয়, বরং চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষের নীতিগত বা সম্পাদকীয় চাপের কারণেই করে থাকতে পারেন। তাই এ ক্ষেত্রে পুরো দায় শুধু উপস্থাপকের ওপর বর্তায় না। সমালোচকদের অভিযোগ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চ্যানেল আই একচেটিয়াভাবে সরকারের প্রশংসা করেছে এবং এর বিনিময়ে বিভিন্ন সুবিধাও পেয়েছে। একইভাবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকেও চ্যানেলটি ধারাবাহিকভাবে সমর্থন জানাচ্ছে।

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষক, গবেষক এবং সাংবাদিকদের একটি অংশ বহুবার বলেছেন, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মূলধারার কিছু গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় অবস্থানেও দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়। ক্ষমতায় থাকা দলের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল এবং বিরোধী দলের প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ অতীতেও উঠেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বিএনপি ও তার শীর্ষ নেতৃত্বকে ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সমালোচকদের দাবি ছিল, এসব প্রতিবেদনের কিছুতে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি ছিল বা রাজনৈতিক ভাষ্য ও তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন বজায় রাখা হয়নি। একইভাবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও দলটির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে প্রকাশিত অনেক প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা ও তথ্যের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারিত টকশোগুলোতে উপস্থাপকের প্রশ্ন, অতিথি নির্বাচন এবং আলোচনার কাঠামো নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মত, সম্পাদকীয় নীতি এবং প্রতিষ্ঠানের অবস্থান—এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য সব সময় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না।

সাংবাদিকতা বিষয়ে কাজ করা অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কোনো টকশোতে উপস্থাপকের দায়িত্ব হলো কঠিন প্রশ্ন করা, তবে সেই প্রশ্নের ভাষা ও ধরন এমন হওয়া উচিত যাতে তা তথ্যনির্ভর, ন্যায্য এবং সব পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দল সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ বা মূল্যায়ন উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তি থাকা জরুরি।

চ্যানেল আই বা সোমা ইসলামের পক্ষ থেকে ভাইরাল ভিডিওটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে পুরোনো ভিডিও, বক্তব্য বা সংবাদ নতুন প্রেক্ষাপটে আবারও ভাইরাল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এ ধরনের কনটেন্ট মূল্যায়নের সময় ভিডিওটির সময়কাল, প্রেক্ষাপট, সম্পাদনার সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, কনটেন্ট নির্মাণে মালিকপক্ষের নির্দেশ—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে জনমত গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।

পুরোনো এই টকশোর ভিডিওও সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে এটি অতীতের গণমাধ্যম চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো কনটেন্ট পুনরায় প্রচারের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তবে ভিডিওটি ঘিরে যেসব অতিরিক্ত দাবি, ব্যাখ্যা বা অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সোমা ইসলামের বিরুদ্ধে, সেগুলোর অনেকগুলোরই স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে যাচাইযোগ্য তথ্য ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া—সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এখনো সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সোমা ইসলাম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250