ছবি: সংগৃহীত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা শাহ আলম খন্দকার প্যারোলে মুক্তি পেয়ে হাতকড়া পরা অবস্থায় মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একজন সন্তানের শেষ বিদায় জানানোর মানবিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ হাতকড়া পরিয়ে জানাজায় উপস্থিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাদ জোহর আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের নুরপুর দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদ মাঠে শাহ আলমের মা হালিমা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিজ বাড়িতে ৭৫ বছর বয়সী হালিমা বেগম মারা যান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।
মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে প্যারোলের আবেদন করা হলে আদালত শাহ আলমকে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির অনুমতি দেন। পরে পুলিশি পাহারায় তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। জানাজায় অংশ নেওয়ার সময় তার হাতে হাতকড়া ছিল। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার মায়ের দাফন সম্পন্ন হয়।
জানাজায় উপস্থিত হয়ে শাহ আলম সবার কাছে তার মায়ের জন্য দোয়া চান। তিনি বলেন, কারাগারে থাকায় মায়ের সেবা করতে না পারার কষ্ট তার জীবনের বড় আক্ষেপ। তিনি আল্লাহর কাছে তার মায়ের জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনা করেন এবং উপস্থিত সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাবেদ উল ইসলাম মুঠোফোনে সুখবরকে জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে শাহ আলম জানাজায় অংশ নেন। নির্ধারিত সময় শেষে বিকেল চারটার দিকে তাকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি একটি সহিংসতার মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে কারাগারে রয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফ রহমান লিখেছেন, "মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া মানবিক সিদ্ধান্ত। তবে নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।" অন্যদিকে নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, "একজন মানুষ শেষবারের মতো মাকে বিদায় জানাতে এসেছে। প্রকাশ্যে হাতকড়া পরিয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল কি না, সেটি ভেবে দেখা উচিত।"
আবার মাহবুব হাসান নামে আরেকজন লেখেন, "আইনের চোখে সবাই সমান। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ব্যবস্থা প্রয়োজন মনে করেছে, সেটিই অনুসরণ করেছে।" রাকিব হোসেন নামে একজনের মন্তব্য, "এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের বন্দিরাও একই ধরনের ব্যবস্থায় স্বজনের জানাজা বা দাফনে অংশ নিয়েছেন।"
অপরাধবিজ্ঞান ও আইন নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, প্যারোলের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে বন্দিকে সীমিত সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ করে দেওয়া। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী হবে, হাতকড়া ব্যবহার করা হবে কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বন্দির ঝুঁকি, মামলার ধরন, পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে। তাদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এমন ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়, যাতে একদিকে মানবিক বিবেচনা রক্ষা পায়, অন্যদিকে নিরাপত্তাও বিঘ্নিত না হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বাংলাদেশেও বিভিন্ন সরকারের আমলে রাজনৈতিক নেতা, সাধারণ আসামি বা দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের পারিবারিক শোকের সময় প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার নজির রয়েছে। একইভাবে নিরাপত্তার স্বার্থে কারও ক্ষেত্রে হাতকড়া ব্যবহার করা হয়েছে, আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী কারও ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। তাই প্রতিটি ঘটনাকে পৃথকভাবে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ, কারা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং নিরাপত্তা মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
খবরটি শেয়ার করুন