ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে সাংবাদিক মুন্নী সাহা আটক হয়েছেন—এমন দাবি করে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হলেও যাচাই করে দেখা গেছে, এটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়; বরং দেড় বছর আগের একটি ভিডিও নতুন করে প্রচার করা হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার ‘GM Tahsin’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ২ মিনিট ২১ সেকেন্ডের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘কারওয়ান বাজার থেকে সাংবাদিক মুন্নি সাহা আটক’। পোস্টটি অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলে। ভিডিওটি দুই লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে, শেয়ার হয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি বার। এতে ৬ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া ও প্রায় দেড় হাজার মন্তব্য জমা পড়ে।
ভিডিওটি এখনকার ঘটনা ধরে নিয়ে অনেকেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। মন্তব্যের ঘরে নানা ধরনের মতামত দেখা যায়। কেউ কেউ সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
নেটিজেনদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম নামের একজন মন্তব্য করেন, “দেশের মানুষ সত্য জানতে চায়। সাংবাদিকদেরও জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত।” আরেকজন, মেহেদী হাসান, লেখেন, “ভিডিও দেখে মনে হচ্ছে ঘটনা আজকের। পরে বুঝলাম এটা পুরোনো ভিডিও। মানুষকে বিভ্রান্ত করা ঠিক না।”
তবে অনেকে আবার এমন পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তানজিলা নওরীন নামের এক ব্যবহারকারী লেখেন, “সামাজিক মাধ্যমে এখন কোনো কিছু দেখলেই বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পুরোনো ভিডিও নতুন বলে চালিয়ে দেওয়া খুব বিপজ্জনক।”
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি মূলত ২০২৪ সালের একটি ঘটনার। সে সময় দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেলের ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে ভিডিওটি প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের ইউটিউব চ্যানেলেও একই ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
সেই সময় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় একদল লোক মুন্নী সাহাকে ঘিরে ধরে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
তেজগাঁও থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোবারক হোসেন সে সময় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, মুন্নী সাহা জনতা টাওয়ারে অবস্থিত অফিস থেকে বের হওয়ার পর স্থানীয় কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। পরে অবশ্য তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়েও মুন্নী সাহাকে বিভিন্ন গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট আয়োজনে অংশ নিতে দেখা গেছে। গত ৮ ও ৯ মে অনুষ্ঠিত মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সে’ তাকে অংশ নিতে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোনো ভিডিও বা তথ্য নতুন দাবি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে বড় ধরনের বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আল মামুন বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে তথ্য যাচাই ছাড়া শেয়ার করার সংস্কৃতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একটি পুরোনো ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে ছড়িয়ে দিলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, সামাজিক উত্তেজনাও তৈরি হতে পারে।”
তথ্য যাচাই–বিষয়ক গবেষক সাবরিনা রহমান বলেন, “অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়। এতে রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। ব্যবহারকারীদের উচিত কোনো ভিডিও দেখেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে উৎস যাচাই করা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ঠেকাতে ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মগুলোরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের যাচাইকৃত তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে-বিদেশে পুরোনো ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। কখনো রাজনৈতিক ঘটনা, কখনো সহিংসতা, আবার কখনো ব্যক্তি-সম্পর্কিত ভিডিও ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা দেখা গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, অ্যালগরিদমনির্ভর সামাজিক মাধ্যম ব্যবস্থায় আবেগপ্রবণ বা বিতর্কিত কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বিভ্রান্তিকর তথ্যও সহজে ভাইরাল হয়ে যায়।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে দেখা কোনো ভিডিও বা তথ্য শেয়ার করার আগে সেটি কোথাকার, কবে ধারণ করা হয়েছে এবং নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যমে এ–সংক্রান্ত তথ্য আছে কি না—তা যাচাই করা জরুরি। না হলে পুরোনো ঘটনার পুনঃপ্রচার নতুন বিভ্রান্তি ও অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন