ফাইল ছবি
ঢাকার তুরাগ নদকে ঘিরে গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি গুরুতর দাবি—আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাতজন নেতা-কর্মীর মরদেহ নদীতে ভাসছে। দাবি ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়। একদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে এটিকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব’ বলা হয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মী এবং দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক মাধ্যমের পেজগুলো দাবি করছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির পর কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন এবং উদ্ধার হওয়া লাশগুলো তাদেরই।
এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যার পর অভিযোগ করেছেন, ‘তুরাগের ঘটনা’ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে নিহতদের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে দেখানোর চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন। তবে তার দেওয়া অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে তুরাগ নদ থেকে কয়টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে? উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় কী? তারা কি রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার, নাকি পৃথক পৃথক দুর্ঘটনার ঘটনা? আর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘সাত লাশ’-এর দাবির পক্ষে কী কোনো তথ্য-প্রমাণ মিলছে?
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ছিল। আশুলিয়া-তুরাগ এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার খবরও আসে। এরপর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে কয়েকজন নিখোঁজ হওয়ার দাবি ছড়িয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে ২৪ ও ২৫ জুন তুরাগ নদ থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়, এগুলো আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের মরদেহ এবং আরও কয়েকজনের লাশ নদীতে রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া তিনজনের একজন মো. সুমন (১৭)। তিনি তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ জুন পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে তিনি বাসা থেকে বের হন। এরপর আর ফিরে আসেননি। ২৫ জুন রাতে আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সুমনের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে খুব বেশি কথা বলতে চাননি। তারা জানিয়েছেন, ছেলের সব ছবি মোবাইল থেকে মুছে ফেলা হয়েছে, বাসার ছবিও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তাদের ভাষায়, সন্তানের স্মৃতি দেখলে মানসিক কষ্ট আরও বাড়বে।
তবে অনুসন্ধানে সুমনের একটি ফেসবুক আইডি পাওয়া যায়, যেখানে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচির ভিডিও এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর একটি শোভাযাত্রার ভিডিও প্রকাশিত ছিল। এতে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিললেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আশুলিয়া থানা-পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের বড় ভাই একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। পুলিশের দাবি, পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী সুমন নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি সাঁতার জানতেন না। অন্য কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
দ্বিতীয় মরদেহটি উদ্ধার হয় আরিফ হাসান রাকিব নামে এক যুবকের। তিনিও রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা। তার চাচা জানান, ২২ জুন সকাল থেকে আরিফ নিখোঁজ ছিলেন। পরে ২৪ জুন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের দাবি, আরিফ যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা তারা আগে জানতেন না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও ও ছবি দেখানোর পর বিষয়টি জানতে পারেন। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সেটিও তাদের জানা নেই। নিয়ম মেনে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে।
তৃতীয় ব্যক্তি রনি মোল্লা। রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা এই ব্যক্তি উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন। পুলিশ ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন কয়েকজনের সঙ্গে গোসল করতে নেমে তিনি পানিতে ডুবে মারা যান। ঘটনাস্থলেই অন্যরা তাকে উদ্ধার করেন। তার পরিবার জানিয়েছে, রনির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না এবং তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগতেন।
অর্থাৎ বর্তমানে নিশ্চিতভাবে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে তুরাগ নদ থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে হয়েছে বলে পুলিশ ও পরিবার উভয়েই বলছে। বাকি দুইজনের মৃত্যুর কারণ তদন্তাধীন থাকলেও এখন পর্যন্ত সেগুলোকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে নিশ্চিত করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বাংলাদেশ পুলিশ শনিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘তুরাগ নদীতে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ ভাসছে’—এমন প্রচার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পুলিশ বলছে, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশও।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দাবি, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির পর কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো সেই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এ দাবির সমর্থনে তারা এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য কিংবা তদন্তসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করেননি।
এই বিতর্কের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেন সজীব ওয়াজেদ জয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থা নিহতদের পরিবারের মাধ্যমে অপমৃত্যুর মামলা করানোর চেষ্টা করছে এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। তবে তার এই বক্তব্যের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ পুলিশের বক্তব্যে আস্থা রাখছেন, কেউ আবার পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি তুলছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী রাকিব হোসেন লিখেছেন, “যদি সত্যিই তিনজন মারা গিয়ে থাকে, তাহলে প্রত্যেকটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। আর যদি সাতজনের দাবিটি মিথ্যা হয়, সেটিও পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করা প্রয়োজন।”
আরেকজন ব্যবহারকারী মেহরীন সুলতানা মন্তব্য করেন, “রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এখন কোনো তথ্যই মানুষ সহজে বিশ্বাস করতে পারছে না। সরকার, বিরোধী দল এবং গণমাধ্যম—সব পক্ষের কাছ থেকেই স্বচ্ছতা প্রয়োজন।”
আবার সোহেল আরমান নামে একজন লেখেন, “ময়নাতদন্ত, সিসিটিভি, মোবাইল ফোনের লোকেশন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য প্রকাশ করা হলে বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে অসমর্থিত তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় একটি সত্য ঘটনার সঙ্গে অতিরঞ্জিত বা যাচাইবিহীন তথ্য যুক্ত হয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। আবার কখনো সরকারি বক্তব্য নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ থেকে যায়, বিশেষ করে যখন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রকাশ্যে আসে না।
তুরাগের ঘটনাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের বাস্তব ঘটনা, অন্যদিকে সাতজনের লাশ ভাসার দাবি, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত তথ্য আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ২৪ ও ২৫ জুন তুরাগ নদ থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তাদের মধ্যে রনি মোল্লার মৃত্যু পানিতে ডুবে হয়েছে বলে পুলিশ ও পরিবার জানিয়েছে। সুমন ও আরিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে ‘আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ তুরাগ নদে ভাসছে’—এ দাবির সমর্থনে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। একইভাবে ‘তুরাগ হত্যাকাণ্ড’ বলে যে অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটিও এখনো তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ফলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত সম্পন্ন করা এবং তার ফলাফল প্রকাশ করা। কারণ রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট কিংবা গুজব—কোনোটিই বিচারিক তদন্তের বিকল্প নয়। প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হলে তবেই স্পষ্ট হবে, তুরাগ নদকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া এই আলোচিত ঘটনার নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল।
খবরটি শেয়ার করুন