ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
‘ফার্মের মুরগি’ বা ‘ব্রয়লার মুরগি’—একটি মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া বিতর্ক এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল অডিওতে তাদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে কটাক্ষ করার অভিযোগ ওঠে। সেই বক্তব্যের প্রতিবাদেই ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে ফেসবুকে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘Broiler Chicken Party’ (ব্রয়লার চিকেন পার্টি) নামে একটি পেজ।
অল্প সময়ের মধ্যেই এটি শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার খোলা পেজটির স্লোগান রাখা হয়েছে, ‘We are not insulted, We are awakened’ (আমরা অপমানিত নই, আমরা জাগ্রত)। পেজটি চালু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিকেল ছয়টা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ অনুসারী যুক্ত হন। পেজটিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পরীক্ষা ইস্যু, শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং ভাইরাল অডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি ব্যঙ্গাত্মক ছবি, মিম, ভিডিও ও ছোট ছোট লেখা প্রকাশ করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতার কারণে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ে। অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি ওঠে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হকের পদত্যাগের দাবিও ওঠে।
এই আন্দোলনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও ভাইরাল হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বা ‘ব্রয়লার মুরগি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করেন আন্দোলনকারীরা। যদিও অডিওটির সত্যতা বা বক্তার পরিচয় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এই মন্তব্যকে অপমানজনক হিসেবে দেখেছেন। তাদের ভাষ্য, এই মন্তব্য কেবল পরীক্ষার্থীদের নয়, পুরো তরুণ প্রজন্মের প্রতি অবমাননাকর মনোভাবের প্রতিফলন।
এমন প্রেক্ষাপটেই ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামের পেজটি তৈরি করা হয়েছে। পেজটির প্রথম দিকের পোস্টগুলোতে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় লেখা হয়েছে, ‘ব্রয়লাররা সংগঠিত হচ্ছে’, ‘খাঁচা থেকে বের হওয়ার সময় এসেছে’, কিংবা ‘আমরা ফার্মের নই, আমরা ভবিষ্যতের নাগরিক।’ এসব পোস্টের সঙ্গে বিভিন্ন কার্টুন, কোলাজ ও মিমও যুক্ত করা হয়েছে। অনেক পোস্টে বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা দিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বাস্তব চিত্র এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনাও স্থান পেয়েছে।
পেজটির একটি পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘যদি প্রশ্ন করার অধিকার থাকে, তাহলে প্রতিবাদের অধিকারও আছে।’ আরেকটি পোস্টে দেখা যায়, ছাতা হাতে হাঁটুসমান পানির মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া শিক্ষার্থীর ছবি, যার ক্যাপশনে লেখা, ‘ব্রয়লারদের দৈনন্দিন জীবন।’ এসব পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই এটিকে সৃজনশীল প্রতিবাদের নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক দল নয়, এটি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক, যার মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহির রহমান নামে একজন লিখেছেন, ‘ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন মানুষ সরাসরি কথা বলতে পারে না, তখন ব্যঙ্গই হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। ব্রয়লার চিকেন পার্টিও সেই ধারার একটি প্রতীক।’ আরেক ব্যবহারকারী সাদিয়া তাসনিম মন্তব্য করেছেন, ‘যারা আমাদের ব্রয়লার ভাবছেন, তাদের জানিয়ে দিতে চাই—এই প্রজন্ম নিজের কথা বলতে জানে।’
আবার রাফি হোসেন নামে এক নেটিজেন লিখেছেন, ‘এটি কোনো রাজনৈতিক দলের জন্ম নয়। এটি একটি সামাজিক বার্তা। একটি অপমানজনক শব্দকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছেন।’ তবে সবাই একমত নন। নাবিল আহমেদ নামে আরেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ব্যঙ্গ অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষ ছড়ানোর দিকে যেন এটি না যায়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা দরকার।’
রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষকদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক বক্তব্য, সরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রতীকী বা ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন গড়ে ওঠার নজির রয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য সাধারণত জনমত আকর্ষণ, প্রতিবাদকে সহজ ভাষায় তুলে ধরা এবং তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
ভারতেও এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘Cockroach Party of India’ (ককরোচ পার্টি অব ইন্ডিয়া)। ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আন্দোলন, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। অনেক তরুণ মনে করছিলেন, সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না এবং নাগরিকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে কয়েকজন তরুণ অনলাইনে ‘ককরোচ পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম চালু করেন।
‘ককরোচ’ নামটি বেছে নেওয়ার পেছনে তাদের যুক্তি ছিল, আরশোলা বা ককরোচকে যেমন অনেকেই অবহেলা করেন, কিন্তু সেটি সহজে টিকে থাকে—তেমনি সাধারণ মানুষের কণ্ঠও উপেক্ষা করা গেলেও পুরোপুরি দমন করা যায় না। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই উদ্যোগ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পায়। যদিও এটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়নি, তবু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও নাগরিক প্রতিবাদের একটি আলোচিত উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছিল।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ এবং ভারতের ‘ককরোচ পার্টি’র মধ্যে একটি মিল রয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের চেয়ে ব্যঙ্গের মাধ্যমে সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তরুণরা অপমানজনক বা অবমাননাকর বলে মনে করা একটি শব্দকে উল্টো নিজেদের পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত করে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
যোগাযোগ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগের মতো শুধু মিছিল বা সমাবেশ নয়, এখন একটি শব্দ, একটি মিম কিংবা একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজও জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্ম রাজনৈতিক বা সামাজিক অসন্তোষ প্রকাশে রসবোধ, প্রতীক এবং ইন্টারনেট সংস্কৃতিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও এ ধরনের উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে তা কতটা ইতিবাচক ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর। কারণ ব্যঙ্গ যেমন প্রতিবাদের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে, তেমনি অসত্য তথ্য বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা এবং শালীনতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ পেজের অনুসারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। নতুন নতুন ব্যঙ্গাত্মক পোস্টও প্রকাশিত হচ্ছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনলাইন ও অফলাইনে প্রতিবাদের নানা সৃজনশীল কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
খবরটি শেয়ার করুন