প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গতকাল জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের পশ্চিম ব্লকে। ছবি: পিআইডি
বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অবিশ্বাসের আবহ কাটিয়ে আবারও সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে ফেরার আলোচনা জোরদার হচ্ছে। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন—সংবিধানসম্মত ও কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ছাড়া দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিত করা কঠিন।
সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। এসব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংসদকে কার্যকর করা, নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের তদারকি জোরদার করা এবং বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো কার্যকর সংসদ, শক্তিশালী কমিটি ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক নির্বাহী বিভাগ। কিন্তু বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দলের বয়কট, সংসদে বিতর্কের ঘাটতি এবং আইন পাসে দ্রুততার কারণে সংসদকে অনেক সময় 'রাবার স্ট্যাম্প' হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন দিয়ে শেষ হয় না। সংসদের ভেতরে কার্যকর বিতর্ক, সরকারের জবাবদিহি এবং নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই এর প্রকৃত অর্থ বাস্তবায়িত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি। বিশেষ করে নির্বাচনব্যবস্থা, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলেও গণতান্ত্রিক নিয়মকানুন মেনে চলা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা জরুরি। অন্যথায় রাজনৈতিক সংঘাত বারবার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা নিয়ে আলোচনা বাড়লেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থা পুনর্গঠন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী করা।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বাড়বে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
তাদের মতে, যদি কার্যকর সংসদ, স্বাধীন নির্বাচন এবং জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার মধ্য দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার (১২ই মার্চ) দেশে শুরু হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা। এই যাত্রা শুরু হচ্ছে নবম সংসদের পর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের তিনটি সংসদ, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধাপ পেরিয়ে। এই সংসদের সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ ২১৯ জন সংসদ সদস্যই নতুন।
জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে আজ বেলা ১১টায় শুরু হবে অধিবেশন। সংসদকে কার্যকর, গঠনমূলক এবং অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কথা বলেছে সরকারি দল ও বিরোধী দল। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে। অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়ে বিরোধিতা আছে তাদের। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সংসদকে কার্যকর করতে সরকার ও বিরোধী দল ভূমিকা রাখবে।
সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অনেক দিন সংসদ নেই। বর্তমান সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল বড় মাত্রায় ভুক্তভোগী। অতীতে যে কারণে সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি, সেগুলো বিবেচনা করে তারা সতর্ক হবেন।’
তিনি বলেন, সরকারকে সরকার চালানোর সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে বিরোধিতা করার সুযোগ দিতে হবে। এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালা। যেহেতু দুই দলেরই অভিন্ন শত্রু (আওয়ামী লীগ) আছে, তাই তারা বিরোধিতার ক্ষেত্রে একটি জায়গায় স্থির থাকবে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ৬ই আগস্ট দ্বাদশ সংসদকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দ্বাদশ সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন বসেছিল ২০২৪ সালের ৩রা জুলাই। সে হিসাবে ১ বছর ৮ মাস ৭ দিন পর আবার বসছে সংসদের অধিবেশন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি এই সংসদের সরকারি দল এবং জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দল। আর আগের চার সংসদে সরকারি দলের আসনে থাকা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কোনো প্রতিনিধিত্বই নেই এই সংসদে।
খবরটি শেয়ার করুন