ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর জ্বালানি তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপে তেলের দাম অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শিগগির শেষ হবে, ট্রাম্পের সোমবারের এই কথার পরদিনই আবার দাম অনেকটা পড়ে যায়।
কিন্তু ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের দোদুল্যমানতা এবং অব্যাহত যুদ্ধের কারণে হুট করেই তেলের বাজার ঠান্ডা হওয়ার কারণ নেই। খবর ডয়েচে ভেলের।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ইরানের হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালি আরও কিছুদিন বন্ধ থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি তেলকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পথে হাঁটছে ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি দেশগুলোর তেলসংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা করে যাচ্ছে তারা। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য তেলের স্থাপনায় হামলা না করার দাবিও করেছে ইরান।
যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে শুরু করে। গত সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম (ব্রেন্ট ক্রুড) ১১৯ ডলারে পৌঁছায়। এরপর ধনী দেশগুলোর জোট জি৭ তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার (১০ই মার্চ) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮৫ ডলারে নেমে এসেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দাম স্থিতিশীল হবে না, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক না হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পুরোদমে তেল উৎপাদন শুরু না করে।
এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা। প্রথমে এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং কিছু বেসামরিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে বিভিন্ন দেশে তেলের স্থাপনায় হামলা চালায় ইরান।
২রা মার্চ সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর বৃহত্তম তেল শোধনাগার রাস তানুরায় ড্রোন হামলা চালায় ইরান। সেদিনই হামলার শিকার হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতারের রাস লাফান।
গত সোমবার গভীর রাতে বাহরাইনের সিত্রা দ্বীপে ইরানি ড্রোনের হামলা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাপকো এনার্জিসের তেল শোধনাগার কেন্দ্র আল মামির।
ওই দিন হামলা প্রতিহত করার খবর জানিয়েছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা জানায়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র শায়বাহের দিকে ধেয়ে আসা চারটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
এসব হামলার পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে আসছে। যেমন সৌদির রাস তানুরায় হামলার পর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ওই কেন্দ্রে দৈনিক সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ করেছে কাতার এনার্জিও।
হামলা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ ও মুসাফ্ফাহ তেল টার্মিনালেও। সেখানে ইরানি ড্রোনের আঘাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েলের সমুদ্রবর্তী গ্যাসক্ষেত্র লেভিয়াথান ও তামার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
গত সপ্তাহে ইরানি ড্রোনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওমানের দুকম ও সালালাহ বন্দর। এতে একটি জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংক ও একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলা হয়েছে অ্যাথে নোভাসহ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজে।
এ ছাড়া ওমানের উপকূলে হামলার জেরে এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের হুমকির জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকেই চড়তে থাকে তেলের দাম।
এ নিয়ে ডয়চে ভেলের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরানের তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের হুমকির কারণে এই পথে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে নরওয়ের অসলোভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ লেওন বলেন, ‘জোর করে প্রণালি বন্ধ করা হোক বা ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়ার কারণে এই পথে তেলের ট্রাংকারের যাত্রা বন্ধ হোক—এসবের প্রভাব মূলত একই রকম। যদি দ্রুত উত্তেজনা হ্রাসের সংকেত না আসে, তাহলে আমরা সপ্তাহের শুরুতে তেলের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির আশঙ্কা করছি।’
এ নিয়ে বুলগেরিয়াভিত্তিক গণমাধ্যম মডার্ন ডিপ্লোমেসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ইরান আসলে হুমকি দিয়েছে, তারা আসলে বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান জ্বালানিব্যবস্থা ধ্বংস করে দিতে চায়। এর মধ্যে দিয়ে পশ্চিমা এবং জ্বালানি আমদানিকারী দেশগুলো এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়।
এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে। সেটি হলো, তাদের সামরিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি বিশ্ব যাতে জ্বালানির সংকটে না পড়ে, সেই দিকে নজর দিতে হচ্ছে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন