শনিবার, ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** শেষকৃত্যের আগে পুলক চ্যাটার্জির পাওনা কি পরিশোধ করবে সমকাল? *** সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহনন, লিখে গেছেন ৫ চিঠি *** বরিশালে পত্রিকা কার্যালয়ে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত লাশ *** ফিলিস্তিনিদের হত্যায় ইসরায়েলের গোপন পদ্ধতি কী, প্রামাণ্যচিত্রে যা উঠে এসেছে *** দাফন নাকি দাহ, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা–বাবার টানাটানিতে হিমঘরে লাশ *** দিল্লি সফরে রাশিয়া থেকে ‘দুর্গসম’ লিমুজিন এনেছেন পুতিন, এর বৈশিষ্ট্য কী *** আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ইউনিট বন্ধ, দেশে লোডশেডিং বাড়ছে *** ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার করা ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার *** গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট লংমার্চে মিটলে আমরাই আগে করতাম: প্রধানমন্ত্রী *** ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির একটিরও সভাপতি পেল না বিরোধী দল

শেষকৃত্যের আগে পুলক চ্যাটার্জির পাওনা কি পরিশোধ করবে সমকাল?

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন, ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

বরিশালের সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি আর নেই। তার শেষ কর্মস্থল দৈনিক সমকালের বরিশাল কার্যালয়েই শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর তার ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া গেছে। যে সংবাদপত্রের সঙ্গে জীবনের প্রায় দেড় যুগ কাটিয়েছেন, চাকরি হারানোর পরও যে কার্যালয়ে মাঝেমধ্যে এসে বসতেন, পত্রিকা পড়তেন, সেই কার্যালয়েই শেষবারের মতো তাকে পাওয়া গেল নিথর অবস্থায়।

পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি চিঠি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর একটি ছিল মৃত্যুর বিষয়ে। অন্যগুলো স্ত্রী, ভাই, সমকাল কার্যালয়ের কর্মী এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের উদ্দেশে লেখা।

পুলক চ্যাটার্জির পরিবারের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাকে কষ্ট দিচ্ছিল। চাকরি হারানোর পর হতাশাও ছিল। কিন্তু তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা পরিবারের কেউ ভাবেননি। তবে এই মৃত্যুর সঙ্গে এখন আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রশ্নটি শুধু পুলক চ্যাটার্জির পরিবারের নয়। প্রশ্নটি দেশের সংবাদমাধ্যমের কর্মপরিবেশ নিয়েও।

পুলক চ্যাটার্জির সমকালের কাছে কোনো পাওনা ছিল কি না, থাকলে তার পরিমাণ কত, কেন তা এত দিন পরিশোধ করা হয়নি—এখন এসব প্রশ্নের উত্তর কি পাওয়া যাবে? তার শেষকৃত্যের আগে কি সমকাল কর্তৃপক্ষ তার পাওনা পরিশোধ করবে? এটি এখন একটি মানবিক প্রশ্ন। একই সঙ্গে এটি সাংবাদিকদের শ্রম ও মর্যাদার প্রশ্ন।

শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে বরিশাল নগরের শ্রীনাথ চ্যাটার্জী লেনের বাড়ি থেকে বের হন পুলক। এরপর তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ধরছিলেন না। তার স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি বিষয়টি সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরীকে জানান। সন্ধ্যার দিকে সুমন চৌধুরী সমকাল কার্যালয়ে যান। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ ছিল। দরজার ফাঁক দিয়ে তিনি পুলক চ্যাটার্জিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ দরজা খুলে মরদেহ উদ্ধার করে।

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা চিঠিগুলো পুলক চ্যাটার্জির হাতের লেখা বলে শনাক্ত করেছেন। তারপরও পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

পুলক চ্যাটার্জি শুধু সমকালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান ছিলেন না। বরিশালের সাংবাদিকতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও তার দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সমকালের বর্তমান ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরী জানিয়েছেন, চাকরি হারানোর পরও পুলক মাঝেমধ্যে অফিসে আসতেন। তার অনুরোধে কার্যালয়ের একটি চাবিও তাকে দেওয়া হয়েছিল। গত প্রায় এক থেকে দেড় মাস তিনি আর অফিসে আসেননি।

চাকরি হারানোর বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী ও ভাই দুজনেই বলেছেন, চাকরি হারানোর পর তিনি হতাশায় ভুগছিলেন। একই সঙ্গে তার শারীরিক অসুস্থতাও ছিল। অর্থাৎ একজন দীর্ঘদিনের সংবাদকর্মী জীবনের শেষ সময়ে এসে একাধিক চাপের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু একজন সাংবাদিকের চাকরি চলে গেলে তার দীর্ঘদিনের শ্রমের মূল্য কি শেষ হয়ে যায়?

একটি সংবাদপত্রে একজন সাংবাদিক ১০ বছর, ১৫ বছর কিংবা ২০ বছর কাজ করলে সেই সময়ের শ্রমের সঙ্গে তার জীবনের একটি বড় অংশ জড়িয়ে থাকে। বেতন, পাওনা, ছুটি, ভবিষ্যৎ তহবিল, ক্ষতিপূরণ কিংবা অন্য কোনো আর্থিক অধিকার থাকলে সেগুলো চাকরি শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। বরং চাকরি শেষ হওয়ার পরই সেসব হিসাব পরিষ্কার করার দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পুলক চ্যাটার্জির ক্ষেত্রে সমকালের কাছে তার পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা এখন জরুরি। মৃত্যুর পরও যদি একজন সাংবাদিকের পাওনা নিয়ে পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয়, সেটি শুধু একটি পরিবারের প্রতি অবিচার নয়। এটি সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদার প্রতিও অবিচার।

এখানে সমকাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও জানা জরুরি। প্রতিষ্ঠানটির কাছে পুলক চ্যাটার্জির কোনো পাওনা ছিল কি না, থাকলে কত ছিল, সেই পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব জনসমক্ষে আসা দরকার। কারণ বিষয়টি এখন আর কেবল একটি ব্যক্তিগত পাওনা-পাওনাদারের বিষয় নয়। এটি সাংবাদিকদের শ্রমের মূল্য নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের সংবাদমাধ্যমে এমন অভিযোগ নতুন নয়। ঢাকার অনেক বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের দিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করায়। তাদের ওপর নির্ভর করে জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বড় একটি অংশ। কিন্তু চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত পারিশ্রমিক, বকেয়া পাওনা, চিকিৎসা সহায়তা কিংবা চাকরি হারানোর পর সুরক্ষা—এসব ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। জাতীয় পর্যায়ের অনেক সাংবাদিকও চাকরি হারানোর পর একই ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েন।

এই বাস্তবতা নিয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর আরও বেশি কথা বলার প্রয়োজন ছিল। পুলক চ্যাটার্জির ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে, দেশে এত সাংবাদিক সংগঠন, এত নেতা ও এত দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের সহকর্মীরা তার পাশে কতটা দাঁড়িয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করা সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি আবেগঘন বাক্য লেখা আরও সহজ। কিন্তু একজন সাংবাদিক চাকরি হারানোর পর তার পাশে দাঁড়ানো, তার পাওনা আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কথা বলা, অসুস্থতার সময় সহযোগিতা করা—এসব অনেক কঠিন কাজ। পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই কঠিন প্রশ্নটিই সামনে এনেছে।

দেশে সাংবাদিকদের মানসিক ও পেশাগত সংকটের ঘটনাও বিচ্ছিন্ন নয়। ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর যশোরে সাংবাদিক দানিয়েল হাবিব নোভা, যিনি নোভা খন্দকার নামেও পরিচিত ছিলেন, আত্মহত্যা করেন। তার মরদেহ নিজ বাড়ির একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক সাইফুর রহমান শাকিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার ঘোষণা দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। পরে তাকে উদ্ধার করা হয়। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকার হাতিরঝিল থেকে সাংবাদিক রাহানুমা সারাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার স্বামী এটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে তখন নানা আলোচনা তৈরি হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়েও সাংবাদিকদের এমন মৃত্যুর খবর এসেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে যশোরের স্থানীয় সংবাদপত্রের সাংবাদিক ছাকিন হোসেন আত্মহত্যা করেন। তার পারিবারিক জীবনের সংকটের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। সাংবাদিক সীমান্ত খোকনের ঝুলন্ত মরদেহ ঢাকার চামেলীবাগের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তা সম্পাদক ছিলেন এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যও ছিলেন। পুলিশ তখন এটিকে আত্মহত্যা বলে জানিয়েছিল।

সাংবাদিকদের পেশাগত অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কারণ সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে অন্যের অধিকার, অনিয়ম ও অবিচারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। অথচ সেই সাংবাদিক নিজেই যদি নিজের বেতন, চাকরি, পাওনা বা চিকিৎসার অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে বিষয়টি সমাজের জন্য গভীরভাবে বিব্রতকর।

২০২৫ সালে দেশের ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনের তথ্য প্রথম আলো প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে তিনজন নিহত, ২৭৩ জন আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত এবং ১৭ জন গ্রেপ্তার হন।

অর্থাৎ সাংবাদিকদের সংকট শুধু চাকরি বা বেতনের নয়। নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশও এর সঙ্গে যুক্ত। পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু তাই শুধু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের শোকের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের কর্মসংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

একজন সাংবাদিককে যখন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানো হয়, তখন তার কাছ থেকে জাতীয় মানের সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করা হয়। তিনি ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন। রাত-বিরাতে ঘটনাস্থলে যান। রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেন। স্থানীয় প্রভাবশালীদের রোষের মুখে পড়েন। অনেক সময় মামলা ও হুমকিও মোকাবিলা করেন। কিন্তু সেই সাংবাদিক চাকরি হারালে তার পাশে প্রতিষ্ঠান কতটা থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সমকালের কাছ থেকে নয়। দেশের সব সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকেই চাওয়া দরকার। গণমাধ্যমের মালিকানা ব্যবসা হতে পারে। একটি সংবাদপত্র বা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারে। কিন্তু সাংবাদিককে তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে সেই ব্যবসা টেকসই ও নৈতিক হতে পারে না। সংবাদমাধ্যমের মালিকেরা যেমন ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখবেন, তেমনি সাংবাদিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

সাংবাদিক কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারযোগ্য যন্ত্র নন। তিনি একজন শ্রমজীবী মানুষ। তারও পরিবার আছে। তারও অসুস্থতা আছে। সন্তানের পড়াশোনা আছে। বাড়িভাড়া আছে। ভবিষ্যতের চিন্তা আছে। পুলক চ্যাটার্জির পরিবারে এখন সেই বাস্তবতাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে সামনে এসেছে।

তার স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি বলেছেন, স্বামী চাকরি হারানোর পর হতাশায় ছিলেন। কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করবেন, তা পরিবার ভাবেনি। তার ভাইও একই ধরনের কথা বলেছেন। অন্যদিকে পুলক চ্যাটার্জি সমকাল কার্যালয়ের বর্তমান ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে একটি চিঠি রেখে গেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেখানে সমকালের কাছে তার পাওনা অর্থ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ ছিল। এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর পর একজন সাংবাদিকের পাওনা নিয়ে তার পরিবারের কাউকে যেন আর দরজায় দরজায় ঘুরতে না হয়। কোনো সাংবাদিক সংগঠনের সুপারিশের অপেক্ষায় থাকতে না হয়। কোনো সংবাদমাধ্যমের মালিকের দয়ার ওপর নির্ভর করতে না হয়। সমকাল চাইলে এখানেই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

পুলক চ্যাটার্জির যদি সত্যিই কোনো পাওনা থেকে থাকে, হিসাব প্রকাশ করে দ্রুত তা তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে। এতে তার পরিবারের আর্থিক সমস্যার সব সমাধান হবে না। তার শূন্যতাও পূরণ হবে না। কিন্তু অন্তত একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ শ্রমের মূল্য তার পরিবারের কাছে পৌঁছাবে। আর যদি কোনো পাওনা না থাকে, সেটিও স্পষ্ট করে জানানো উচিত। হিসাব-নিকাশ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা পরিষ্কার করা উচিত।

কারণ পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে তদন্ত চলবে। মৃত্যুর কারণ নিয়ে পুলিশ তার নিজস্ব অনুসন্ধান করবে। কিন্তু তার পেশাগত জীবনের পাওনা-পাওনাদারির হিসাব নিয়ে অস্পষ্টতা থাকার কোনো কারণ নেই।

বরিশালের সাংবাদিকেরা একজন সহকর্মীকে হারিয়েছেন। তার পরিবার হারিয়েছে একজন স্বামী, একজন বাবা, একজন আপনজনকে। সাংবাদিক সমাজ হারিয়েছে দীর্ঘদিনের এক সহযোদ্ধাকে। এই শোকের মধ্যে সবচেয়ে নির্মম দৃশ্য হবে—একজন সাংবাদিকের শেষযাত্রা সম্পন্ন হয়ে গেলেও তার বহু বছরের শ্রমের পাওনা নিয়ে পরিবারকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তাই প্রশ্নটি আবারও সামনে রাখা দরকার-শেষকৃত্যের আগে পুলক চ্যাটার্জির পাওনা কি পরিশোধ করবে সমকাল?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলকের পরিবারের জন্য নয়। উত্তরটি দেশের হাজারো সাংবাদিকের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ পুলক চ্যাটার্জি, কাল অন্য কেউ হতে পারেন। একটি গণমাধ্যম তখনই সত্যিকার অর্থে মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তি অর্জন করে, যখন নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও সে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে।

সাংবাদিকদের দিয়ে সমাজের অন্যায়ের খবর করিয়ে তাদের নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদমাধ্যমের মালিকদের সাংবাদিকের শ্রমকে সস্তা পণ্য হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও শোকবার্তা আর সভা-সমাবেশের বাইরে এসে সদস্যদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই দায়বদ্ধতার পরীক্ষাও বটে।

সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250