ফাইল ছবি
শেখ হাসিনার সঙ্গে ‘৪০টি বিমান’ নিয়ে ঢাকায় নামার ঘোষণা দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সেটি নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক হাস্যরস, ট্রল ও সমালোচনা। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এতগুলো বিমান একসঙ্গে কোথায় অবতরণ করবে, আবার কেউ মন্তব্য করেছেন, বক্তব্যটি রাজনৈতিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ হলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল খুবই কম।
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। একই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তিনি ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হলেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল।
শেখ হাসিনার ওই ঘোষণার পর লন্ডনে অবস্থানরত সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী একটি বক্তব্য দেন, যার ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং এরপর থেকেই সেখানে অবস্থান করছেন।
ভিডিওতে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন এবং পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। তার ভাষ্য, ইংল্যান্ড থেকেই ১০টি চার্টার্ড বিমান নেতাকর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশে যাবে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা যোগ দেবেন। তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে হয়তো ৪০টিরও বেশি বিমান একসঙ্গে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামবে।”
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, সরকার যদি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে প্রবাসীরা প্রতিক্রিয়া দেখাবেন এবং সরকারের মন্ত্রী-এমপি কিংবা তাদের সহযোগীদের বিদেশে যেতে দেওয়া হবে না। তার বক্তব্যের শেষাংশে তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেন, “উনি যেটা বলেন, সেটা করেন। উনি জাতির পিতার কন্যা, উনি শেখ হাসিনা। মাইন্ড ইট।”
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ফেসবুকজুড়ে শুরু হয় নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া। অনেকেই বিষয়টিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে হাস্যরসের উপাদান হিসেবে দেখছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী রাশেদুল ইসলাম লিখেছেন, “৪০টা বিমান একসঙ্গে নামবে! আগে দেখি হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের পার্কিং কোথায় পাওয়া যায়।” তার মন্তব্যে শত শত ব্যবহারকারী হাসির প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
আরেক ব্যবহারকারী নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “বিমান কি বাসের মতো? সায়েদাবাদে যেমন একটার পর একটা ঢোকে, এখানেও কি তেমন হবে?” তানভীর আহমেদ নামে একজন লিখেছেন, “মনে হচ্ছে আবেগে বাস বলতে গিয়ে বিমান বলে ফেলেছেন।”
সামিয়া রহমানের মন্তব্য, “এতগুলো বিমান ল্যান্ড করাতে হলে নতুন করে আরেকটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বানাতে হবে।” মো. সাকিব হোসেন লিখেছেন, “৪০টা বিমান নামলে আগে রানওয়ের জ্যাম সামলাবে কে?”
আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক দিকটিও তুলে ধরেছেন। মাহমুদুল হাসান নামে একজন লিখেছেন, “যারা দেশে থাকার কথা বলতেন, তাদের অনেকেই এখন বিদেশে। তাই এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষ খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
রুবাইয়াত করিম নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, “নেতারা বিদেশে নিরাপদে আছেন, আর কর্মীদের আবেগী বক্তব্য দিয়ে মাঠে নামতে বলছেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়।” কেউ কেউ আবার রসিকতার সুরে লিখেছেন, “আজকের সেরা কমেডি ভিডিও দেখে ফেললাম”, “বিমান কি বরিশালের লঞ্চ?”, “৪০টা বিমান নামাতে গেলে আকাশেও ট্রাফিক পুলিশ লাগবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক বক্তব্য এখন দ্রুতই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের উপাদানে পরিণত হয়। বিশেষ করে বাস্তবতার সঙ্গে যার ব্যবধান বেশি, সেটি মুহূর্তেই মিম, ট্রল ও রসিকতার বিষয় হয়ে ওঠে।
এদিকে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী নিজেও বর্তমানে আইনি জটিলতার মধ্যে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা রয়েছে। একই অভিযোগের তদন্তের স্বার্থে আদালত তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিলেন। পরে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মী আবেগঘন বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে সেই বক্তব্যের কিছু অংশ বাস্তবতার নিরিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর ‘৪০টি বিমান’ মন্তব্যও তার ব্যতিক্রম নয়। রাজনৈতিক সমর্থকেরা এটিকে প্রতীকী ভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় একটি অংশ সেটিকে আক্ষরিক অর্থে ধরে ব্যাপক ট্রল ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে মেতে উঠেছে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আলোচনা যেমন চলছে, তেমনি তার সমর্থকদের কিছু বক্তব্যও জনপরিসরে নতুন বিতর্ক ও হাস্যরসের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে ‘৪০টি বিমান’ নিয়ে ঢাকায় নামার ঘোষণাটি এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি আলোচিত ঘটনাতেও পরিণত হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন