রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সাক্ষাতের ভিডিওটি সম্পর্কে যা জানা গেল

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৪:৫৯ অপরাহ্ন, ১৩ই মে ২০২৬

#

ফাইল ছবি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল মঙ্গলবার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ মে ভারতীয় মিডিয়াকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ভিডিওটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয় এবং বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে এটি শেয়ার করা হতে থাকে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলোচিত দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ভিডিওটি বর্তমান সময়ের নয়; এটি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী একটি মতবিনিময় সভার ভিডিও।

‘বাংলাদেশ’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মঙ্গলবার ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। পোস্টে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ার পায়। ১২ মে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ভিডিওটিতে ২ হাজার ৬০০–এর বেশি রিঅ্যাকশন, শতাধিক মন্তব্য এবং প্রায় দুই শত শেয়ার দেখা যায়। ভিডিওটি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেশীয় বা ভারতীয় কোনো মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ বা বৈঠকের খবর পাওয়া যায়নি।

সাধারণত সাবেক বা বর্তমান সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাক্ষাৎ নিয়ে দুই দেশের সংবাদমাধ্যমেই আলোচনা হয়। কিন্তু আলোচিত দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদ বা বিবৃতি অনুপস্থিত ছিল। পরবর্তীতে ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ‘Bangladesh Global’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ‘দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে নির্বাচনোত্তর মতবিনিময় প্রধানমন্ত্রীর’ শিরোনামের ওই ভিডিওটির সঙ্গে বর্তমানে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির দৃশ্য, বক্তব্য ও পরিবেশ হুবহু মিলে যায়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি নতুন কোনো ভিডিও নয়।

একই দিনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে গণভবনে বিদেশি সাংবাদিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ এবং বাংলাদেশ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উদাহরণ তৈরি করেছে।

তবে সেই নির্বাচনকে ঘিরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছিল। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী ওই মতবিনিময় সভা তখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, একই ভিডিও চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি ‘আশার আলো’ নামের আরেকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ধরনের দাবিতে পোস্ট করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ভিডিওটি নতুন দাবি দিয়ে একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এতে বোঝা যায়, পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে বিভ্রান্তি তৈরির প্রবণতা এখনও সক্রিয় রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ভিডিও বা ছবিকে নতুন দাবি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া এখন খুবই সাধারণ একটি প্রবণতা। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আলোচিত ব্যক্তিদের ঘিরে মানুষের আগ্রহ বেশি থাকলে এমন বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়।

তাদের মতে, ভিডিও বা ছবির প্রেক্ষাপট বদলে দিলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ অনেক সময় আবেগের বশে বা রাজনৈতিক অবস্থান থেকে যাচাই ছাড়াই শেয়ার করে ফেলেন। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সংস্কৃতি—এই দুই কারণে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সহজে ছড়িয়ে পড়ে। তাই কোনো তথ্য দেখেই বিশ্বাস না করে, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মে যাচাই করা জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভিডিওটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী রাকিব হাসান মন্তব্য করেন, “ভিডিও দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল সত্যি নতুন কোনো বৈঠক হয়েছে। পরে বুঝলাম পুরোনো ভিডিও। এখন বুঝতেই কষ্ট হয় কোনটা আসল, কোনটা নয়।” আরেক ব্যবহারকারী তানজিলা নওরীন লেখেন, “রাজনৈতিক ভিডিও নিয়ে মানুষ খুব দ্রুত উত্তেজিত হয়ে পড়ে। অনেকে ইচ্ছা করেই পুরোনো ভিডিও নতুন বলে চালায়।”

নেটিজেন সাইফুল ইসলাম লিখেছেন, “যাচাই না করে শেয়ার করা ঠিক না। এতে বিভ্রান্তি বাড়ে এবং মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয়।” অন্যদিকে মেহজাবিন রহমান নামে একজন মন্তব্য করেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন যেকোনো ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু সেটার সময়, স্থান বা প্রেক্ষাপট যাচাই করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ব্যক্তিত্বদের ঘিরে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য বেশি ছড়ায়, কারণ এসব কনটেন্ট মানুষের আগ্রহ তৈরি করে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে ভিডিও কনটেন্ট মানুষের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়ায় সেটি সহজেই প্রভাব ফেলে।

তথ্য যাচাইকারী কয়েকটি প্ল্যাটফর্মের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরোনো ভিডিওকে নতুন দাবি দিয়ে প্রচারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক সময় ভিডিওর মূল উৎস খুঁজে বের করলেই প্রকৃত তথ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু অধিকাংশ ব্যবহারকারী সেই যাচাইয়ের ধাপে যান না।

সব মিলিয়ে অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছে, শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারতীয় মিডিয়াকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন—এ দাবিটি ভিত্তিহীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওটি মূলত ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী মতবিনিময় সভার ভিডিও, যা নতুন ঘটনার দাবি দিয়ে আবারও প্রচার করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250