ফাইল ছবি
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ, পাশাপাশি বাড়ছে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করে সুখবর ডটকমকে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত আট সপ্তাহে শুধু ঢাকা বিভাগেই হামে আক্রান্ত হয়ে ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২১ জন এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তিনজন মারা গেছে।
একই সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই সপ্তাহে অন্তত ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু এবং প্রায় ৬০০ শিশুর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১২ দিনে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে প্রায় ৭০ শিশু চিকিৎসাধীন।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ২৪ শিশু ভর্তি রয়েছে, যার মধ্যে মা ও শিশু হাসপাতালে গত ১০ দিনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
সিলেটে গত তিন দিনে ৩০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে, আর রংপুর বিভাগের আট জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষায় হাম ও রুবেলার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
খুলনা ও বরিশালেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, ২৪ মার্চ পর্যন্ত খুলনায় নয়জন এবং বরিশালে ৩৯ জন আক্রান্ত হয়েছে।
ঢাকা বিভাগের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। গত দুই মাসে এখানে ৬০১ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৩৯১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা দক্ষিণে ৬৯, নারায়ণগঞ্জে ৩১, গাজীপুরে ২০ এবং নারসিংদীতে ১৬ জন আক্রান্ত হয়েছে। কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজশাহী বিভাগেও পরিস্থিতি অবনতির দিকে। চলতি বছরের শুরু থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৩৪২ জন সন্দেহভাজন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পরীক্ষায় ৭৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলায় সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্নই এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সালের মতে, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকা সরবরাহ, অর্থায়ন ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি সাধারণত চার বছর পরপর পরিচালিত হয়।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে এই কর্মসূচিতে বিলম্ব হয়েছে। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে।
এদিকে টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে টিকার কার্যকারিতা, সংরক্ষণ পদ্ধতি বা প্রয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে আলাদা ‘আইসোলেশন কর্নার’ চালু করা হয়েছে। সিলেটেও একটি হাসপাতালকে পুরোপুরি আইসোলেশন সেন্টার ঘোষণা করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ সুবিধা না থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে আলাদা মেডিকেল টিম গঠন ও বিশেষ কর্নার চালু করেছে।
চট্টগ্রামে হামে মৃত্যুর বিষয়ে ভিন্নমত দেখা গেছে। কিছু চিকিৎসক মৃত্যুর কথা জানালেও জেলা সিভিল সার্জন দাবি করেছেন, হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোনো নিশ্চিত তথ্য তার কাছে নেই।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার নতুন করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা টিকা কেনার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী জুলাই-আগস্টে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে টিকাদান জোরদার, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন