প্রতীকী ছবি
দেশের গণমাধ্যমে কর্মরত নারী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় আসছে। নারী গণমাধ্যমকর্মীদের কর্মপরিবেশে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়।
নারীরা কর্মক্ষেত্রে মৌখিক, অনলাইন ও শারীরিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে জরিপ ও অভিজ্ঞতায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ চিত্রে একটি নতুন প্রবণতা যুক্ত হয়েছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হিসেবে সামনে আসছেন পুরুষ সাংবাদিকেরাও।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, নারীদের পাশাপাশি পুরুষ সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা যৌন নির্যাতন, এমনকি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। নারী সাংবাদিকদের তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি এখনও কম হলেও তা উপেক্ষণীয় নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
বিশেষ করে নবীন সাংবাদিক ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বেলায় ঝুঁকি বেশি। অভিযোগ রয়েছে, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন সহকর্মী বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কেউ কেউ প্রভাব খাটিয়ে নারী ও পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষ সাংবাদিকদের যৌন নির্যাতনের ভুক্তভোগী হিসেবে সামনে আসা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিরাপদ পরিবেশ ও জবাবদিহির অভাবেরই প্রতিফলন। সংখ্যায় কম হলেও তাদের ভুক্তভোগী হিসেবে উঠে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সাংবাদিকেরা যেখানে জনমত গঠন ও ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, সেখানে নিউজরুমে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশের অভাব সত্যিই উদ্বেগজনক। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের শিকার হলে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি, তাছাড়া পুরুষেরা ধর্ষণের শিকার হলে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার পাওয়া খুব কঠিন। বিষয়টি তাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার।
নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদের নেতারা মনে করছেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলছেন, সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের চুপ না থেকে ঘটনার প্রতিকার চাইতে সোচ্চার হতে হবে। যৌন হয়রানির প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি এসব বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াবসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে বৈঠক করার আহ্বান জানান।
আরো বলেন, পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক, সম্পাদক ও ব্যবস্থাপকেরা যেন ঘটনা প্রতিকারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন, সেটা নিশ্চিত করা উচিত।
সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, এতে অংশগ্রহণকারী ৯ গণমাধ্যমকর্মী (৭ জন নারী ও ২ জন পুরুষ) ধর্ষণের শিকার হন। দেশের গণমাধ্যমগুলোর ৬০ শতাংশ নারী ও ৯ শতাংশ পুরুষ মৌখিকভাবে যৌন হয়রানি, ৪৮ শতাংশ নারী ও ১৫ শতাংশ পুরুষ অনলাইনে যৌন হয়রানি আর ২৪ শতাংশ নারী ও ৭ শতাংশ পুরুষ শারীরিকভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন।
তারা সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সহকর্মীদের মাধ্যমে নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল প্রতিক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মৌখিক হয়রানির অভিযোগগুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে—নারীদের করা অভিযোগের ৪৩ শতাংশ এবং পুরুষদের ৬০ শতাংশ অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আর যেসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রায়ই শুধু সতর্কবার্তায় সীমাবদ্ধ ছিল। যা মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার অভাবকে স্পষ্ট করে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
জানা গেছে, ওয়ান-ইফরা উইমেন ইন নিউজ, ‘সিটি সেন্ট জর্জেস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’ ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন ২০২৫ সালে ওই জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৩৯ বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ সংবাদকর্মীর মধ্যে ১৫ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হন। ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। জরিপের ভিত্তিতে সাজানো সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
জরিপে দেশের সংবাদকর্মীদের মধ্যে সাংবাদিক, ফটোসাংবাদিক, কারিগরি ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন এমন ব্যক্তি ছিলেন ২৪২ জন। সম্পাদক, প্রযোজক, ব্যবস্থাপক, বিভাগীয় প্রধান, টিম লিড পর্যায়ের সংবাদকর্মী ছিলেন ৮৬ জন। সংবাদমাধ্যমের নির্বাহী, পরিচালক, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক পর্যায়ে অংশ নেন ১০ জন। শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজনও এই জরিপে অংশ নিয়েছিলেন।
জানা গেছে, এতে বাংলাদেশসহ আরব অঞ্চল, সাবসাহারা আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ২০টি দেশের সংবাদকর্মীরা জরিপে অংশ নেন। বাংলাদেশ থেকে অংশ নেন ৩৩৯ সংবাদকর্মী। এর মধ্যে ১০০ জন নারী, ১৯০ জন পুরুষ ও বাকি ৪৯ জন তাদের লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় জানাননি।
জরিপটি প্রকাশের পর দেশের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার এই বিষয়ে শক্তিশালী একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। গত ২৭ মার্চ প্রকাশিত ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয়টি দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে একটি জরুরি বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে।
'নিউজরুমে যৌন হয়রানি বন্ধ হোক: মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে' শিরোনামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে ডেইলি স্টার বলে, নিউজরুমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি পেশাগত সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত। নিউজরুমে যৌন হয়রানির কোনো স্থান থাকতে পারে না।
অনেকের প্রশ্ন, একই জরিপকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যান্য গণমাধ্যম কেন নীরব? তাদের মতে, এখানেই ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি শুধু তথ্য তুলে ধরেনি, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা এবং করণীয় নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, অধিকাংশ গণমাধ্যমের নীরবতা একটি অস্বস্তিকর সত্যকে ইঙ্গিত করে—নিজেদের ঘরের ভেতরের সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে অনীহা।
এই নীরবতার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অভিযোগ ব্যবস্থার অভাব, যা থাকলে সম্পাদকীয় অবস্থান নেওয়া সহজ হতো। তৃতীয়ত, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, যা অনেক ক্ষেত্রে যৌন হয়রানিকে গুরুত্বহীন বা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করে।
অভিজ্ঞরা বলছেন, পুরুষ ভুক্তভোগীরা এতদিন সামনে আসেননি মূলত সামাজিক লজ্জা, ‘পুরুষত্ব’ নিয়ে প্রচলিত ধারণা এবং পেশাগত ক্ষতির ভয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ জানানোর মতো কার্যকর কাঠামো না থাকায় ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন।
তাছাড়া গণমাধ্যমের ভেতরের এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয় না বললেই চলে। প্রভাবশালী হওয়ায় অভিযুক্ত সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা দেশে প্রায় বিরল।
পুরুষ ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্তত সাতজন গণমাধ্যমকর্মী সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অভিযোগ করার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নেই। কোথাও কোথাও নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবে প্রয়োগ হয় না। ফলে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরীর মতে, অনেক ভুক্তভোগী প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ করার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরেন, যা সত্যতা যাচাই ও বিচার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিষয়টি কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের সমস্যা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে স্বতন্ত্র কমিটি গঠন, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
পাশাপাশি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব কর্মীর জন্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি নারী হোক বা পুরুষ—দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীর পরিচয় নয়, অপরাধের গুরুত্বই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।
খবরটি শেয়ার করুন