ফাইল ছবি
দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা। এই সংকট মোকাবিলায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে—অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পুনরায় পাঠদানে যুক্ত করার পরিকল্পনা।
সাময়িক সমাধান হিসেবে হলেও, এই উদ্যোগ শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষক স্বল্পতা এবং এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে দেরির কারণে অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায়, অভিজ্ঞ ও শারীরিকভাবে সক্ষম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে উপজেলাভিত্তিক একটি ‘শিক্ষক পুল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি, গভর্নিং বডি বা এডহক কমিটির অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী এই পুল থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে।
এটি হবে সাময়িক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালু রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে যে বাস্তবতা রয়েছে, তা সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্যেই স্পষ্ট।
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। মোট বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪ হাজার ১২৯টি। জানুয়ারিতে এনটিআরসিএ ৬৭ হাজার ২০৮টি পদের বিপরীতে ১১ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করলেও, এরপরও প্রায় ৫৫ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য থেকে গেছে। এই বিশাল শূন্যতাই শিক্ষক সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।
তবে এনটিআরসিএ’র পক্ষ থেকে শিক্ষক সংকট বা নিয়োগে বিলম্বের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম সুখবর ডটকমকে বলেন, “এই নিয়োগ (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক) শিক্ষক সংকট বা নিয়োগে বিলম্বের কারণে না।” তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেখানে এমপিওভুক্ত পদ ফাঁকা নেই, কিন্তু অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন, সেখানেই এই পুল থেকে শিক্ষক নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমানে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আগের মতো বিলম্ব হয় না। যদিও বাস্তবতা হলো, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগে, এবং সেই সময়টাতে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
ফলে, এই শূন্যস্থান পূরণে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবসম্মত একটি পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক নেতাদের একটি বড় অংশ এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জ্ঞান ও দক্ষতা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে এর মাধ্যমে। বিশেষ করে গ্রামীণ বা দূরবর্তী অঞ্চলে, যেখানে যোগ্য শিক্ষক পাওয়া কঠিন, সেখানে এই উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মো. মাজহারুল হান্নান বলেন, “সংকটকালীন সাময়িকভাবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া যেতেই পারে, আপাতদৃষ্টিতে ভালোই মনে হচ্ছে।” তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের দলীয়করণ না ঘটে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে সচেতন থাকতে হবে।
অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ মনজুর আহমদও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তিনি জানান, অতীতে গঠিত শিক্ষা সংস্কার কমিটিও এমন সুপারিশ করেছিল। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা আছে? তার মতে, “হয়তো কিছু স্কুল পারবে, কিন্তু যেখানে বেশি দরকার, সেখানে পারবে কি না—সেটা ভাবতে হবে।”
একজন বেসরকারি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই উদ্যোগ সাময়িকভাবে উপকারী হলেও কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। যেমন, যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাত্র তিন মাসের জন্য নিয়োগ পান, তাহলে একটি পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে। আবার একজন শিক্ষক ক্লাস নিলেন, আরেকজন শিক্ষক পরীক্ষা মূল্যায়ন করলেন—এতে শিক্ষার ধারাবাহিকতায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তবে এসব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, সামগ্রিকভাবে উদ্যোগটির ইতিবাচক দিকই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা কার্যক্রম যাতে বন্ধ না হয়, শিক্ষার্থীরা যাতে নিয়মিত ক্লাস করতে পারেন—সেই লক্ষ্য পূরণে এটি একটি কার্যকর ‘ব্রিজ সল্যুশন’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
এনটিআরসিএ চেয়ারম্যানও স্পষ্ট করে বলেছেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ কখনোই নিয়মিত নিয়োগের বিকল্প নয়। বরং এটি একটি সহায়ক ব্যবস্থা, যেখানে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সাময়িক ঘাটতি পূরণ করা যাবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারের এই উদ্যোগটি সময়োপযোগী এবং বাস্তবধর্মী বলে অভিজ্ঞরা মনে করছেন। শিক্ষক সংকটের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না হলেও, অন্তত শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই তাদের আশা।
খবরটি শেয়ার করুন