ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী ও সদস্য সচিব কৃষিবিদ মিজানুর রহমান এ আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থানের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সভাপতি এবং পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদের কো-কনভেনার ড. এম. অহিদুজ্জামান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটুকে সাময়িক বরখাস্ত ও তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘটনায় সংগঠনটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ৩১ আগস্টের সভায় ওই তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাদের কথিত ভূমিকা ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটির সুপারিশের পর তাদের সাময়িক বরখাস্ত এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত শিক্ষকেরা অভিযোগ অস্বীকার করে প্রশাসনিক হয়রানি এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ করেছেন। একই সভায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না করে শিক্ষক হওয়ার অভিযোগে সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউর রহমান ওরফে সায়েম রানাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিষয়ে পৃথক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিবেচনায় তদন্ত কমিটি গঠন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিরত থাকতে হবে। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে দেশে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব শিক্ষাঙ্গন ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উৎকর্ষ তো দূরের কথা, বিদ্যমান মান বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, মিথ্যা অজুহাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিরোধী মত স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চবিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে মব সৃষ্টি করে শিক্ষকদের শারীরিকভাবে আঘাত বা মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি। নানা অজুহাতে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত ও পদাবনতি করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব ঘটনা শিক্ষকদের আত্মহত্যার প্ররোচনা পর্যন্ত দিয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাংবাদিক শেখ জামাল।
সংগঠনটির ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল এবং এর পেছনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল, তারা দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করবে এবং শিক্ষাঙ্গনে সরকারের বিরোধী মনোভাবাপন্ন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট করা থেকে প্রশাসনকে বিরত রাখবে। তবে এসব বিষয়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপক হতাশা দেখা যাচ্ছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এবং কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ, অভিজ্ঞ ও স্বনামধন্য অধ্যাপকদের চাকরিচ্যুত করার লক্ষ্যে নানা অজুহাতে তদন্ত কমিটি গঠন এবং সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা ঘটেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিক্ষকদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে এবং এর ফলে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী মুক্তচিন্তা, রাজনৈতিক মতচর্চা ও স্বাধীন মনোভাব নিয়ে চলাফেরার অধিকার শিক্ষকদের রয়েছে। তাদের স্বীকৃত মৌলিক অধিকার হরণের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলে ভবিষ্যতে তা আরও প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে সমাজে আগে থেকেই থাকা বিভক্তি আরও তীব্র হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ বিশেষভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপিকা ড. সাদেকা হালিমের সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। ২৮ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তাকে শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে অশিক্ষকসুলভ আচরণ এবং নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সময়ে আরও কয়েকজন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
সংগঠনটির বিবৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আজমল হোসেন ভূইয়াসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করছে সংগঠনটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে এর আগেও শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি জুলাইয়ের শেষ দিকে ১০ শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। সংগঠনটি অভিযোগ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত কমিটি ও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে শাস্তি দেওয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কও আগস্টের শুরুতে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছিল। সংগঠনটি সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ২৩১ শিক্ষকের একটি তালিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ‘উইচ-হান্ট’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানির সংস্কৃতি তৈরি না করার আহ্বান জানায়।
আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ শিক্ষকের একটি তালিকা নিয়েও আলোচনা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য জানিয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য চাওয়ায় তারা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে; নিজেরা ওই তালিকা তৈরি করেনি। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে প্রশ্নও ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ১৬ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাষ কুমার কর্মকারকে যৌন হয়রানির অভিযোগে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়। তিনি অবশ্য নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলে দাবি করেন। এর আগে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুজন সেনকে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে পাঁচ বছরের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং পদাবনতি করা হয়। পরে তার স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে।
পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদের বিবৃতিতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. আহসান হাবীব হেলাল, অধ্যাপক ডা. সুবাস দেসহ বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ শিক্ষক-চিকিৎসকসহ ৩৬ জনকে নিয়মনীতি অনুসরণ না করে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও করা হয়েছে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের যুগ্ম-সম্পাদক অধ্যাপক ড. পূর্বা ইসলামসহ অনেক শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে মনগড়া অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলেও সংগঠনটি দাবি করেছে। একইভাবে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিগুলোর নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ বলেছে, এসব কমিটির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আরও অনেক শিক্ষককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাকরিচ্যুত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও সংগঠনটির দাবি।
বিবৃতিতে পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ শিক্ষক, চিকিৎসক ও কৃষিবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে এ ধরনের নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ডকে ‘চরম অমানবিক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির আহ্বায়ক ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী ও সদস্য সচিব কৃষিবিদ মিজানুর রহমান এসব পদক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করে শিক্ষাঙ্গনে সম্প্রীতি বজায় রাখার মাধ্যমে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
খবরটি শেয়ার করুন