ফাইল ছবি
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই পেতেই মার্চ মাস, হঠাৎ কারিকুলামে পরিবর্তন, ছুটিসহ নানা কারণে শ্রেণি পাঠদানেও ব্যাপক ঘাটতি- এর মধ্যেই পরীক্ষার সূচি তিন মাস এগিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্ত এসেছে। আগামী বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা সামনে আসছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। খবর বিবিসি বাংলার।
শিক্ষক এবং অভিভাবকদের কেউ কেউ বলছেন, শ্রেণি পাঠদান এবং লেখাপড়ার সুযোগ না দিয়ে কেবল একতরফাভাবে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। মার্চ-এপ্রিল সম্ভাব্য সময় ধরে মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রাজশাহীর ধোপাঘাটা আলহাজ কলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনভিয়া সুলতানা। কিন্তু হঠাৎ তিন মাস এগিয়ে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করায় আতঙ্কিত এই শিক্ষার্থী।
"এতদিন ভেবেছি পরীক্ষা মার্চের শেষে অথবা এপ্রিলে হতে পারে। কিন্তু এখন জানুয়ারির শুরুতেই, এটা কিছু হলো? কীভাবে সিলেবাস শেষ করবো- চিন্তা হচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান ঊষা বলছেন, "বই পেয়েছি মার্চ মাসে, ক্লাসও ঠিকমতো পাইনি- কোচিং করে, বাসায় পড়ে কোর্স এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।" দেশের শিক্ষাঙ্গণে সেশনজট কমাতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা। কিন্তু এক্ষেত্রে একবারে তিন মাসের বাড়তি চাপ না দিয়ে ধাপে ধাপে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত হবে বলেই মত তাদের।
এ ছাড়া প্রথম বছরে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব যেসব শিক্ষার্থীর ওপর পড়বে, তারা কতটা শ্রেণিশিক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে? ছুটি ছিল কয়দিন? বই পেয়েছে কখন? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আরও ভাবা দরকার ছিল বলে মনে করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "অভিভাবকদের অনেকে আমাকে বলেছেন যে, জানুয়ারিতে বোর্ড পরীক্ষা হওয়ায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তড়িঘড়ি করে জুন মাসেই প্রি-টেস্ট পরীক্ষা নিতে চায়। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটু বেশি কঠিন হয়ে গেল না?"
দেশে সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষা এবং এপ্রিল মাসে উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
কিন্তু করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা সূচি ওলটপালট হওয়ার পর থেকেই এই ধারায় পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শুরু হলেও ২০২৫-এ আবারও দেরিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারির শুরুতে আয়োজন করার সরকারি সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের বেশ বিপাকে ফেলবে বলেই মনে করছেন শিক্ষক এবং অভিভাবকরা।
যার কারণ হিসেবে আগামী বছরের শিক্ষার্থীদের বই হাতে পাওয়া এবং শিক্ষা কার্যক্রমের সময়সূচির বিষয়টি সামনে আনছেন শিক্ষকদের অনেকে। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীরা বোর্ড পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে কতটা সময় পাচ্ছে, এই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি সরকার।
ঢাকার একটি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলছেন, এই শিক্ষার্থীদের সব বই পেতে মার্চ মাস হয়েছিল, তারপরই শুরু হয় রোজার ছুটি, এখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে, ক্লাস হচ্ছে না, এরপরই আবার ঈদের ছুটি শুরু হবে। অর্থাৎ বছরের ছয় মাস সেভাবে ক্লাসই হয়নি, ঈদুল আজহার ছুটির পর ক্লাস খোলার ১০ থেকে ১৫ দিন পরই অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় বসবে শিক্ষার্থীরা।
"শিক্ষকরা যে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এসএসসি পরীক্ষার আগে বিশেষ কেয়ার নেবেন, সেটাও কিন্তু সম্ভব হবে না। এই ঘাটতি আপনি কীভাবে পূরণ করবেন?" বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলেই মনে করছেন সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ জুয়েল রানা। তিনি বলছেন, এর ফলে শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভরতা বাড়বে।
"এই শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিকের শুরুতে করোনা পেয়েছে, এরপর দেশের রাজনৈতিক ডামাডোল, একাধিকবার কারিকুলাম বদলেছে- এবার হঠাৎ করেই দশম শ্রেণিতে এসে বোর্ড পরীক্ষা তিন মাস এগিয়ে আনা হলো- এটা ভালো কিছু বয়ে আনবে না," বলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের বিষয়টি সামনে আনছেন আরেক শিক্ষক মলয় কান্তি হালদার। তিনি বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসাটা স্বাভাবিক, কিন্তু যেনতেনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেই শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষায় পাস করছে, শিখছে না।
তিন মাস এগিয়ে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। তাদের কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় না রেখেই পরীক্ষার বিষয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
"সেশনজট কমাতে হবে, এটি ঠিক, কিন্তু একটি ব্যাচের থেকে একাধারে তিন মাস কেড়ে নেওয়া, এটি আমি যুক্তিসংগত মনে করি না," বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকার নারিন্দা এলাকার বাসিন্দা হারুন অর রশিদ।
সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানান, ২০২৭ সালের মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা ৬ জুন অনুষ্ঠিত হবে। এসব পরীক্ষার একটি প্রস্তাবিত রুটিনও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের তুলনায় তিন মাসেরও বেশি সময় আগেই আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় বসতে হবে শিক্ষার্থীদের।
এক্ষেত্রে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেশনজট নিরসন এবং পাঠ্যসূচি সময়মতো শেষ করে শিক্ষার্থীদের জনমিতিক সুবিধা দেওয়ার জন্যই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো- এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষাই প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে আয়োজন করা। "আমাদের লক্ষ্য হলো ক্রমান্বয়ে গ্যাপ কমিয়ে আনা। ডিসেম্বরকে আমরা পরীক্ষার জন্য আদর্শ মাস হিসেবে নির্ধারণ করেছি এবং সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে," বলেন তিনি।
তিনি বলছেন, বর্তমানে সেশনজটের কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে অনেক শিক্ষার্থীর ২০ বছর বয়স হয়ে যাচ্ছে, যা জাতীয়ভাবে জনমিতির বড় ক্ষতি। প্রাথমিকভাবে আগামী বছর থেকেই পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসের কথা মাথায় রেখে জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিকুলাম পরিবর্তন কিংবা পাঠ্যবই সংশোধনের নামে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন নতুন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সমালোচনা রয়েছে। আর এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে গবেষণানির্ভর সমন্বিত ও পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলে আসছেন শিক্ষাবিদ এবং গবেষকরা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা এগিয়ে আনার বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে পরিকল্পনা ও গবেষণানির্ভর তথ্যের ঘাটতি রয়েছে বলেই মনে করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী।
এই সিদ্ধান্তের ফলে যারা ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে, তাদের সঙ্গে তেমন আলোচনা হয়নি বলেই মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কিছুটা সময় নেওয়া উচিত ছিল বলেই মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।
"শিক্ষার্থীদের সেশনজটের কারণে ক্ষতি হয়, এটা ঠিক, কিন্তু আমার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব কেমন, সেটা কি আমি দেখেছি?" বলেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে পরীক্ষা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হবে বলেও মনে করেন তিনি।
"পরীক্ষা নিয়ে যখন শঙ্কা তৈরি হয়, তখনই অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের জন্য কোচিংয়ের দিকে ধাবিত হন। আমার জানা মতে, অনেক অভিভাবক ইতোমধ্যেই কোচিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি। পরীক্ষা এগিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ।
তিনি মনে করেন, লেখাপড়ার চাপ তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা এই সময়ের মধ্যেই বোর্ড পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবেন। "পরীক্ষার সময় পেছাতে পেছাতে আমরা আসলে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে অনেক সময় নষ্ট করছি। অনেক শিক্ষার্থী মোবাইলের পেছনেও অধিক সময় ব্যয় করছেন," বলেন তিনি।
খবরটি শেয়ার করুন