ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের সংকটে খুলনা অঞ্চলে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। বোরো চাষের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে সেচ দিতে না পারলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা করছেন কৃষক।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের জালিয়ারডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান গাজী এ বছর দুই বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। গত ৪-৫ দিন আগে একদিনের বৃষ্টিতে জমিতে কিছুটা পানি জমলেও গত ২ দিন ধরে তা পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে পাশের ঘের থেকে সেচ দিতে পারছেন না তিনি। কারণ, কোথাও জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না।
স্থানীয় সাংবাদিকদের এই প্রান্তিক কৃষক বলেন, 'পাশের একটি পেট্রল পাম্পে কয়েকবার গেলেও সেখানে গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে তেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এই মুহূর্তে সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখন সেচ দিতে না পারলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।'
তিনি আরও বলেন, 'ঠিকমতো পানি না পেলে ধানগাছ শুকিয়ে যাবে, থোড় বের হবে না, পোকা লাগার আশঙ্কাও আছে। ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে।'
নিজের জমির সম্ভাব্য ফলনের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, সাধারণত তার জমিতে ৪৫-৫০ মণ হারে প্রায় ১০০ মণ ধান হওয়ার কথা। কিন্তু সেচ সংকটের কারণে তা কমে ৪০-৫০ মণ হতে পারে।
খুলনা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তাকে দেখা যায় পাম্প মেশিনের পরিবর্তে হাত দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জমিতে যে অল্প পানি আছে, সেটি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
তার পাশের জমির কৃষক অমৃত বিশ্বাসও একই সংকটে পড়েছেন। ৩ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন তিনি। প্রতি ৫ দিন পরপর সেচ দিতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৩ লিটার তেল। কিন্তু গত ১০-১২ দিন ধরে কোথাও তেল পাচ্ছেন না তিনি।
কৃষক অমৃত বিশ্বাস বলেন, 'আমাদের গ্রামের কাছেই আব্দুল লতিফ ফিলিং স্টেশনে ২-৩ বার গেছি। কিন্তু তারা শুধু গাড়িতে তেল দিচ্ছে, পাত্রে দিচ্ছে না।'
'খোলা বাজারে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে। এ সময় কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়া উচিত। না হলে বড় ক্ষতি হবে,' বলেন তিনি।
বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের শুকদাড়া গ্রামের কৃষক প্রবীর মন্ডল এ বছর ৫ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। জ্বালানি সংকটের কারণে তিনিও খোলা বাজার থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'একদিন সেচ দিলে দেড় দিন লাগে না। কিন্তু একদিন সেচ দিতেই আমার ৪ লিটার তেল লাগে। গত ১৫ দিন ধরে ১৩০-১৩৫ টাকা দরে আমতলা বাজার থেকে তেল কিনছি। তাও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। ওই বাজারে দুটি দোকান ছিল, তার মধ্যে একটি তেলের সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে।'
তিনি এ সমস্যার সমাধানে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ সংকটে শুধু কৃষকরাই নন, ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষও। পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের শলুয়া গ্রামের বাসিন্দা দীপক দাশ জানান, তার মুরগির খামার ও সেচের জন্য ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু কপিলমুনি বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও গত কয়েকদিনে কোথাও তেল পাননি।
খুলনার ৪টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও খোলা বাজারে তেল বিক্রি হলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
ডুমুরিয়া উপজেলার খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, যেন গ্রাহকরা ভেতরে ঢুকতে না পারেন। সেখানে নোটিশে লেখা—'তেল নাই'। সেখানে কর্মরতরা জানান, তেল পেলেই পাম্প চালু করা হবে।
খবরটি শেয়ার করুন