রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ‘লন্ডন সমঝোতার’ বিষয়ে যা জানা গেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০২:১৬ অপরাহ্ন, ১৮ই মে ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক দিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান সরকারে অন্যতম প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত ১৩ মে তিনি দেশ ছেড়েছেন—এ তথ্য নিশ্চিত হলেও কোথায় গেছেন, কেন গেছেন এবং সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, জল্পনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে।

বিষয়টিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে একই সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের যুক্তরাজ্য সফর এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কিছু নেতার যুক্তরাজ্যে অবস্থানের বিষয়টি।

সাধারণত মন্ত্রীদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে সফরের উদ্দেশ্য, সময়সূচি বা সরকারি আদেশ (জিও) নিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়। সালাউদ্দিন আহমদ মন্ত্রী হওয়ার পর একাধিক দেশ সফর করলেও এই প্রথমবারের মতো তার বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও দেওয়া হয়নি কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি। মন্ত্রীর দপ্তর ও তার ব‍্যক্তিগত কর্মকর্তাদের কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। ফলে রহস‍্য আরও বেড়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এবার সফরের শুরুতে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি সামনে না আসায় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন-৬) শরীফুল ইসলাম জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ সফরের জন্য জিও হয়েছে এবং সেটি পারিবারিক সফর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিনি এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) এটিএম শাহীন আহমেদ গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, ১৩ মে সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন। তবে তিনি কোন দেশে গেছেন বা কী উদ্দেশ্যে গেছেন, সে বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।

আবার মন্ত্রীর একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ভিন্ন ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথমে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান, পরে সেখান থেকে লন্ডনে যান, যেখানে তার কন্যা বসবাস করেন। এই ভিন্নমুখী বক্তব্যগুলোই মূলত জনমনে প্রশ্নের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, রহস্যের বড় অংশ তৈরি হয়েছে তথ্যের ঘাটতি থেকে। কারণ যখন সরকারি পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না, তখন শূন্যস্থান পূরণ করতে নানা গুঞ্জন, অনুমান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাখ্যা জায়গা করে নেয়।

একই সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। ৯ মে শুরু হওয়া তার সফর শেষ করে তিনি আজ সোমবার, ১৮ মে দেশে ফিরেছেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স এবং বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ছিলেন।

এই দুই সফরের সময়কাল কাছাকাছি হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বিশেষভাবে আলোচনায় আসে একটি দাবি—লন্ডনে রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের কয়েক নেতার মধ্যে একটি গোপন বৈঠক হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তি।

ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা যায়। তবে এসব আলোচনার উল্লেখযোগ্য অংশে নির্দিষ্ট তথ্যসূত্র বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী আরিফ রহমান নামে একজন লিখেছেন, “দেশের রাজনীতিতে অনেক কিছুই আড়ালে হয়। তাই এমন বৈঠকের গুঞ্জন একেবারে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।” নাসরিন জাহান নামে আরেকজন লিখেছেন, “প্রমাণ ছাড়া শুধু ভিডিও বানিয়ে বা পোস্ট দিয়ে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। মানুষ এখন খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে চলে যায়।”

রাকিব হোসেন নামে আরেক ব্যবহারকারীর মন্তব্য ছিল, “সরকার যদি শুরুতেই পরিষ্কার করে বলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কোথায় আছেন, তাহলে হয়তো এত আলোচনা হতো না।”

সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণার একটি অংশে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির সম্মানে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত একটি নৈশভোজে রাষ্ট্রপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং সেখানেই গোপন আলোচনা হয়েছে।

তবে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একজন কূটনীতিক এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ওই নৈশভোজ শুধু রাষ্ট্রপতির সম্মানে আয়োজন করা হয়েছিল এবং সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। ওই কূটনীতিক আরও জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে লন্ডনে অবস্থান করছেন, সে সম্পর্কেও হাইকমিশনের কাছে কোনো তথ্য নেই।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকেও এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, লন্ডনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। একই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তথ্যের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক গুজবের অন্যতম বড় উৎস। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গোপন সমঝোতা নিয়ে মানুষের আগ্রহ সবসময় থাকে। কিন্তু আগ্রহ আর বাস্তবতা এক বিষয় নয়। কোনো দাবি গ্রহণযোগ্য হতে হলে তার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ থাকতে হবে।

গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমের বড় একটি সমস্যা হলো—সেখানে সন্দেহ দ্রুত সত্যের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ প্রায়ই তথ্য যাচাইয়ের আগেই মতামত তৈরি করে ফেলে। যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সফর বা কার্যক্রম নিয়ে অস্পষ্টতা থাকে, তখন নানা ধরনের বর্ণনা তৈরি হয়। এগুলোর কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে।

এদিকে রাষ্ট্রপতির যুক্তরাজ্য সফর নিয়েও ভিন্ন ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিকিৎসা উপলক্ষে যুক্তরাজ্যে গিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রথমে হিলটন হোটেলে ওঠেন, পরে ক্যামব্রিজের নিউমার্কেট এলাকায় একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ও তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানা হৃদ্‌রোগের ফলোআপ চিকিৎসা নেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, সফরের সময় রাষ্ট্রপতির প্রটোকলের জন্য একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি ভাড়া করা হয় এবং সফরসঙ্গীদের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগ বা তথ্য নিয়ে অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কোনো বক্তব্য সামনে আসেনি।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, একটি বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে গোপন সমঝোতা বৈঠকের যে দাবি ছড়িয়ে পড়েছে, তার পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ সামনে আসেনি।

রাজনীতিতে গুজব নতুন কিছু নয়। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে গুজবের গতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে কোনো তথ্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে সেটি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং কতটা প্রমাণনির্ভর—সেই প্রশ্নটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250