ছবি: সিসিটিভির ফুটেজ থেকে নেওয়া
বরিশাল নগরের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ব্যবসায়ীকে মারধর করে তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে জোর করে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের একটি সিসিটিভি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশে মব সহিংসতার পরিবর্তিত রূপ।
ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও প্রশ্ন উঠেছে আরও গভীর একটি বিষয় নিয়ে—ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কি নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে? আর শারীরিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল স্থানে আঘাত বা চাপ দিয়ে স্বীকারোক্তি বা স্বাক্ষর আদায় কি মব সহিংসতার নতুন কৌশল হয়ে উঠছে?
গত ২৭ জুন সন্ধ্যার পর বরিশাল নগরের সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী (আবাসন) হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর গতকাল শনিবার রাতে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদার নিজেই কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এরপর ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি প্রকাশিত হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, আব্দুল আজিজের কক্ষে চারজন যুবক প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামের একজন তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে দুটি চেক ও একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পুরো ঘটনার সময় ভিডিওতে তাকে 'বাচ্চু, বাচ্চু' বলে কাউকে ডাকতে শোনা যায়।
পরে আরেকজন ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাকে কিছুক্ষণ আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। একই সময়ে স্বাক্ষর নেওয়ার দৃশ্য মোবাইল ফোনেও ধারণ করা হয়। স্থানীয় সূত্র সুখবর ডটকমকে বলছে, অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তার বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ আজ রোববার দুপুরে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, লিটু একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। পরে বিনিয়োগের বিপরীতে জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব চূড়ান্ত করা হয় এবং কোনো পাওনা নেই—এমন অঙ্গীকারনামাও দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও লিটু তার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করতে থাকেন।
২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কয়েকজনকে নিয়ে অফিসে এসে তাকে মারধর করে জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক এবং দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুল আজিজ বলেন, ঘটনার পরই তিনি ব্যাংকে অভিযোগ করেন। ফলে ওই চেক থেকে অর্থ উত্তোলন সম্ভব হয়নি। পরে তিনি আদালতে নালিশি মামলা করেন। আদালত মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজ তিনিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন বলে সুখবর ডটকমের কাছে স্বীকার করেন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি মুঠোফোনে সুখবর ডটকমের কাছে দাবি করেন, তারা সবাই ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন এবং আব্দুল আজিজ তাদের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে পরে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আফরোজা খানম নাসরিন সুখবর ডটকমকে বলেন, কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রকাশ্যে এভাবে কাউকে লাঞ্ছিত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিএনপি বা সহযোগী সংগঠনের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী থানায় এসে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। আদালতের আদেশের কপি রোববার থানায় পৌঁছাতে পারে।
এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যবসায়িক বিরোধের অভিযোগ নয়; বরং এটি নতুন করে সামনে এনেছে মব সহিংসতার প্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে চাঁদাবাজি, সালিশ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করা বা ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে দলবদ্ধভাবে হামলা, ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে আইনবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেছেন।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন স্থানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বহু ঘটনা নিয়ে জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা বিতর্কের পাশাপাশি আলোচনায় আসে ‘মব জাস্টিস’ বা জনতার বিচারের প্রবণতা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিভিন্ন অভিযোগে মানুষকে দলবদ্ধভাবে মারধর, অপদস্থ করা, ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া এবং কখনো হত্যার ঘটনাও বেড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে জানায়, ওই বছরে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংস্থাটির মতে, অনেক ঘটনাই আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না; বাস্তবে মব সহিংসতার পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের বাংলাদেশবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সহিংসতার পর প্রতিশোধমূলক হামলা, গণপিটুনি, সংবাদমাধ্যমে আক্রমণ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নানা ঘটনার কথাও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় রাষ্ট্রীয় আইনপ্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়লে জনতার বিচারের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং সেটি আইনের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অণ্ডকোষ মানবদেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গগুলোর একটি। সেখানে তীব্র চাপ বা আঘাত সাময়িক অসহনীয় ব্যথা থেকে শুরু করে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তিকে এমনভাবে নির্যাতন করা শুধু শারীরিক হামলা নয়, নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের মধ্যেও পড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ব্যবসায়িক বিরোধ থাকলেও তার নিষ্পত্তির একমাত্র পথ আদালত। অন্যদিকে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, যদি কারও বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থেকেও থাকে, তবে দলবদ্ধভাবে হামলা ও জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার অধিকার কারও নেই। আবার অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার অর্থ হলো অপরাধীরা শাস্তির ভয় আগের তুলনায় কম অনুভব করছে।
বরিশালের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি বিপরীত দাবি সামনে এসেছে। একদিকে আব্দুল আজিজের অভিযোগ, তাকে মারধর করে অণ্ডকোষ চেপে ধরে ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক এবং দুটি সাদা স্ট্যাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মোস্তাফিজুর রহমান লিটুর দাবি, আব্দুল আজিজ তাদের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন; এ বিষয়ে তিনি পরে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরবেন। ফলে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব এখন তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিও ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে, তবে সেটিই একমাত্র প্রমাণ নয়। সাক্ষ্য, ফরেনসিক পরীক্ষা, ব্যাংক-সংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেই তদন্তকারী সংস্থাকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন