ফাইল ছবি
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান, কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। একদিকে জুলাইপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ও সংগঠন দাবি করছে যে আওয়ামী লীগ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক বা আইনগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা গেলেও তার রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক ভিত্তি বা ঐতিহাসিক উপস্থিতি সহজে মুছে ফেলা যায় না।
সম্প্রতি প্রচারিত ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ টকশোতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দল নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হলে তা তেমন কাজে আসে না। বরং নির্বাচনে যদি জনগণ প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সেটা বেশি কার্যকর হয়। নেপালে গিয়ে সেটাই দেখে এসেছি। অথচ আমাদের দেশে নিষিদ্ধ করে, ভোটে সুযোগ না দিয়ে আওয়ামী লীগকে বরং সুবিধাই করে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন জুলাই আন্দোলন নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনার সুযোগ পাচ্ছে। বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলছে। ভোটে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হলে এসব বলার সুযোগ পেত না।”
ড. স্নিগ্ধার এই বক্তব্য নতুন নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়ে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, কোনো দলের আদর্শ, সংগঠন বা সামাজিক ভিত্তি যদি জনগণের মধ্যে প্রভাবশালী থাকে, তাহলে শুধু প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেই রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণ বিলীন করা কঠিন।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণে দলটির ভূমিকা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থাকা, বিরোধী দলে থাকা, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
তবে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পর দলটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও জমা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ প্রশাসনিক প্রভাব, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সুশাসন সম্পর্কেও দেশি-বিদেশি মহলে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। ফলে দলটির জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জনসমর্থনের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—কোনো রাজনৈতিক দলকে আইনি বা প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ করা হলে কি তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়?
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তরটি সরল নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ভিন্ন নামে, ভিন্ন কাঠামোয় বা নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। আবার কোথাও কোথাও দীর্ঘমেয়াদে জনসমর্থন হারিয়ে দলগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে কোনো দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি জনসমর্থন, সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার বক্তব্যে এই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের রায়ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বৈধতা তৈরি করে। অন্যদিকে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় দলটির সমর্থকদের কাছে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ওই টকশোতে দেশের বর্তমান সংসদীয় কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন চলাকালে কয়েক সদস্যের বক্তব্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। ড. স্নিগ্ধা এ প্রসঙ্গে বলেন, “এর চেয়ে সংসদে মমতাজের গানই ভালো ছিল।” তার মতে, কয়েক সংসদ সদস্যের বক্তব্যে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বা অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ বেশি উঠে আসছে।
তিনি অভিযোগ করেন, কোনো কোনো সদস্য জাতীয় বাজেটের মৌলিক বিষয় সম্পর্কেই পর্যাপ্ত ধারণা প্রদর্শন করতে পারছেন না, আবার কেউ কেউ ভুল তথ্যও দিচ্ছেন।
আলোচনায় অংশ নেওয়া সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজও সংসদে ভুল তথ্য বা অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, “কারও বক্তব্যে পাওয়া যাচ্ছে গর্হিত অন্যায়। কেউ দিচ্ছেন ভুল তথ্য। এক্ষেত্রে সংসদের অভিজ্ঞতা কম থাকায় কেউ কেউ ভুল করছেন। অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে এই ভুল কমে আসবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সংসদের কার্যকারিতা ও মান নিয়ে আলোচনা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের স্থান নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি ও নীতিনির্ধারণেরও কেন্দ্র। ফলে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য, আচরণ এবং তথ্যনির্ভর বিতর্ক জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ড. স্নিগ্ধার মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে বাস্তবধর্মী রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহাসিক ও বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক প্রভাব সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করছে, আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে শুধু রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিতর্ক আসলে দলটির বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থানের চেয়েও বড় একটি প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেটি হলো—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সংঘাতের সমাধান কীভাবে হবে? প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা, আইনগত ব্যবস্থা, নাকি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায়—কোন পথ সবচেয়ে কার্যকর?
এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে অনেকেই একমত। দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের নাম, ইতিহাস এবং প্রভাব এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও রাজনৈতিক টকশো, সংবাদ বিশ্লেষণ, সংসদীয় বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় আওয়ামী লীগ বারবার ফিরে আসছে। ফলে দলটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে—এমন দাবি যেমন বিতর্কিত, তেমনি দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
দেশের রাজনীতি বর্তমানে একটি পুনর্গঠনের পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা, নির্বাচনী রাজনীতির ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নগুলো আগামী দিনগুলোতেও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেই থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের প্রাসঙ্গিকতা টিকে থাকবে কি না, সেটি নির্ধারণ করবে জনগণের সমর্থন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা—এমন মতই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন