ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক পরিসরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে বিদেশি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্টজনেরা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
বামপন্থী অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ নিজের ফেসবুক পোস্টে অনুষ্ঠানের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, ‘জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণ কি মার্কিন দূতাবাসের জায়গা? তাদের দূতাবাস নামক দুর্গে কি জায়গা কম পড়েছে? বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, সবচাইতে বড় মানবাধিকার লংঘনকারী, বিশ্বের দেশে দেশে গণহত্যার কারিগর যুক্তরাষ্ট্র—এক ভয়াবহ চুক্তি নামের আদেশপত্র বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপানোর পর তারা এখন তাদের উৎসব উদযাপন করে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গনে! সরকার তার খাতায় একটি বড় অপরাধ যোগ করলো।’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমীন আল রশীদও ফেসবুকে এ আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি লেখেন, ‘একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জাতীয় সংসদ ভবনে আরেকটি দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে সেই দেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কবে কোথায় ঘটেছে, সেটি অনুসন্ধানের বিষয়।’
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিদের একজন হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, দেশের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা করেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই কান। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক স্থাপত্য নির্মাণে অনন্য অবদান রেখেছেন বাংলাদেশি-আমেরিকান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খান।
তার ভাষায়, এই পারস্পরিক অবদান প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র আক্ষরিক অর্থেই একে অপরের ইতিহাস বিনির্মাণে সহায়তা করেছে।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো মার্কিন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসনের ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এক অবিস্মরণীয় অবদান। আজকের এই সংগীতায়োজনও সেই একই মানবিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করছে, যা শুধু বাণিজ্য বা কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বে রূপ দিতে সহায়ক হবে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও সরকারের প্রতি দেশটির ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ এবং অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তার ভাষায়, দুই দেশের টেকসই উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন অবদান ও যৌথ অঙ্গীকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন তার বক্তব্যে বলেন, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা ঘোষণা করেছিলেন, ‘সকল মানুষ সমান’। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আলোকে দেশটি বৈশ্বিক অংশীদারত্ব আরও জোরদারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। এ সময় ককাসের সদস্য, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সংসদ সচিবালয়ের সচিব এবং অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন নিয়ে একদিকে যেখানে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এমন আয়োজনের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন