ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
আহমেদ তোফায়েল
গত রোববার রাতে কুমিল্লা নগরীর ছোটরা পশ্চিমপাড়া ঈদগাহ এলাকায় মায়ের হাত ধরে হাঁটছিল আট বছরের শিশু স্মৃতি। নানার বাড়িতে মামার বিয়ের আনন্দঘন পরিবেশ শেষে মায়ের সঙ্গেই বাড়ি ফিরছিল সে। ভারী বর্ষণে পুরো সড়ক তখন পানির নিচে। রিকশা না পেয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় হঠাৎ মায়ের হাত গলে রাস্তার পাশের খোলা ড্রেনের ভাঙা স্ল্যাবের ফাঁক দিয়ে তলিয়ে যায় সে।
মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে যখন তাকে উদ্ধার করা হলো, তখন সে আর জীবন্ত শিশু নয়, একটি নিথর লাশ। একটি ভাঙা স্ল্যাব, একটুখানি নাগরিক অসচেতনতা আর বর্ষার জমা জল মিলে মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিল।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) কর্মকর্তারা এই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন, সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের এই প্রথাগত দুঃখপ্রকাশ কি একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবে? কিংবা এই ঘটনা কি প্রথম? ঢাকা বা চট্টগ্রামের পর এবার কুমিল্লাতেও ড্রেনে পড়ে মৃত্যুর এই পুনরাবৃত্তি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার কোন কঙ্কালসার রূপকে উন্মোচিত করে?
মৃত্যুফাঁদ যখন উন্নয়নের অনুষঙ্গ
আমাদের দেশের শহরগুলোতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন বা সংস্কার মানেই যেন নাগরিকদের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি ও বিপদের কারণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই এলাকায় ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছিল। বেশ কিছু জায়গায় স্ল্যাব খোলা ছিল এবং অনেক স্ল্যাব আগে থেকেই ভাঙা ছিল। বৃষ্টির পানিতে যখন সড়ক তলিয়ে যায়, তখন কোনটা রাস্তা আর কোনটা গভীর ড্রেন—তা চেনার কোনো উপায় থাকে না।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য কিছু লোক ব্যক্তিগত উদ্যোগে পকেট স্ল্যাব সরিয়ে রাখায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। দায় এড়ানোর এই চেনা সংস্কৃতি আমাদের চেনা। যদি নাগরিকরা স্ল্যাব সরিয়েও থাকে, তবে উন্মুক্ত সেই ড্রেনের চারপাশে কোনো লাল পতাকা, ব্যারিকেড বা সতর্কবার্তা কেন দেওয়া হলো না? আধুনিক নগর পরিকল্পনায় যেকোনো সংস্কার কাজের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ‘জননিরাপত্তা’ বা ‘পাবলিক সেফটি’। দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশের কোনো সিটি করপোরেশন বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কাজ করার সময় নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমলে নেয় না। খোঁড়াখুঁড়ি করে রাস্তা ফেলে রাখা, ড্রেন খোলা রাখা আমাদের চেনা দৃশ্য। ফলে, উন্নয়ন এখানে নাগরিকের স্বস্তির বদলে মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।
জবাবদিহির অভাব ও দুঃখপ্রকাশের রাজনীতি
স্মৃতির বাবা বিল্লাল হোসেনের আর্তনাদ, "কার কাছে বিচার চাইবো? মেয়েটিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল।" এই প্রশ্নটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। আমাদের দেশে যেকোনো কাঠামোগত অবহেলাজনিত মৃত্যুর পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, প্রশাসন থেকে সমবেদনা জানানো হয় এবং কিছু আর্থিক অনুদানের আশ্বাস দিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একে ‘একটি দুর্ঘটনা’ বলে অভিহিত করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু আইনি পরিভাষায় একে কি শুধুই ‘দুর্ঘটনা’ বলা চলে? যেখানে কতৃপক্ষের চরম অবহেলা এবং তদারকির অভাব স্পষ্ট, সেখানে একে ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে কেন বিবেচনা করা হবে না?
যখন কোনো রাষ্ট্রীয় বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান করদাতার টাকায় ড্রেন নির্মাণ বা সংস্কার করে, তখন সেই ড্রেনের কারণে একজন নাগরিকের সুরক্ষার দায়িত্বও সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা থাকলে এই অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু বিচারের এই দীর্ঘহীন সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক দায়মুক্তির কারণে আজ কুমিল্লা, কাল ঢাকা, পরশু চট্টগ্রামে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
শহুরে জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ
স্মৃতি মৃত্যুর মূল অনুঘটক ছিল ড্রেনটি পানির নিচে তলিয়ে থাকা। কুমিল্লা নগরীতে সামান্য বৃষ্টিতেই কেন এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হবে, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন ও কালভার্ট তৈরি করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর উপযোগিতা ও পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের গলদ রয়েছে। ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় জ্যাম হয়ে থাকে, নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। আর যখন পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাও করা হয় বর্ষার মরসুমে, তাও আবার কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই।
উন্নয়নের সূচকে আমরা যতোই এগিয়ে যাই না কেন, আমাদের শহরগুলো দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। ফুটপাত তৈরি করা হয় পথচারীদের নিরাপদে হাঁটার জন্য। কিন্তু সেই ফুটপাতের নিচে যদি লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর গহ্বর, তবে নাগরিকরা যাবে কোথায়? ভারী বর্ষণে রিকশা না পেয়ে মা-মেয়ে হেঁটে ফিরছিল—এটিই তো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফুটপাতের এই ভাঙা স্ল্যাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই।
আমরা মনে করি...
এই অচলাবস্থা ও মৃত্যুর মিছিল থেকে বের হয়ে আসতে হলে আমাদের পুরো নগর উন্নয়ন ভাবনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু আশ্বাস বা সমবেদনা প্রকাশের সংস্কৃতি বন্ধ করে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রথমত, প্রতিটি সিটি করপোরেশনে একটি স্বাধীন ‘সেফটি অডিট টিম’ বা ‘নিরাপত্তা তদারকি দল’ গঠন করতে হবে। কোনো ড্রেন, কালভার্ট বা সড়ক সংস্কারের কাজ চলাকালীন সেখানে পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, সতর্কীকরণ চিহ্ন এবং রাতে আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ড্রেন উন্মুক্ত রাখা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, ভাঙা স্ল্যাব মেরামতের জন্য যে চলমান প্রকল্পের কথা কুসিক কর্তৃপক্ষ বলেছেন, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত করে অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু কুমিল্লা নয়, দেশের প্রতিটি ছোট-বড় শহরের সমস্ত ভাঙা স্ল্যাব চিহ্নিত করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তা সংস্কার করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকের অবহেলায় যেমন শাস্তির বিধান আছে, তেমনি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে কোনো প্রাণহানি ঘটলে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি আইনে কঠোর ব্যবস্থার নজির স্থাপন করতে হবে। মৃত শিশুর পরিবারকে শুধু নামমাত্র নয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আজীবন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যেন কতৃপক্ষ বুঝতে পারে অবহেলার মূল্য কতটা চড়া।
আট বছরের শিশু স্মৃতির মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বাতি নিভিয়ে দেয়নি, বরং আমাদের পুরো সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার গাফিলতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আজ স্মৃতির জায়গায় যেকোনো বিত্তবান বা নীতি-নির্ধারকের সন্তানও থাকতে পারত। এই শহরকে আমরা আর কত নিথর শিশুর লাশের ভাগাড়ে পরিণত করব? কুসিকের প্রশাসক মহোদয় ঢাকা থেকে ফিরে এসে পরিবারটির সাথে দেখা করবেন এবং সহায়তার হাত বাড়াবেন—তা ইতিবাচক।
কিন্তু স্মৃতির বাবার সেই প্রশ্ন—‘কার কাছে বিচার চাইবো’—এর উত্তর খোঁজা বেশি জরুরি। আমরা কি একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য শহর পাব না, যেখানে অন্তত মায়ের হাত ধরে হেঁটে বাড়ি ফেরার ন্যূনতম নিরাপত্তা থাকবে? স্মৃতির চলে যাওয়া যেন আর দশটা সংবাদের মতো হারিয়ে না যায়; এই ভাঙা স্ল্যাবগুলো দ্রুত জোড়া লাগুক, আমাদের নগর পিতাদের অবহেলার ঘুম ভাঙুক—এটুকুই প্রত্যাশা।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
খবরটি শেয়ার করুন