রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

প্রবীণ রাজনীতিকরা কারাবন্দি কেন, ফজলুর রহমানের প্রশ্ন

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৩:৫৯ অপরাহ্ন, ১৩ই মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবীণ নেতাদের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি রাখার প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। বেসরকারি একটি টেলিভিশন টকশোতে তিনি আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ এবং ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননের মতো বর্ষীয়ান রাজনীতিকদের কারাবন্দি রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে মানবিকতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আইনের প্রয়োগ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা।

ফজলুর রহমান বলেন, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রবীণ নেতা বর্তমানে বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তাদের দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা উচিত কি না, তা নিয়ে সমাজে বিতর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, প্রায় ৮৯ বছর বয়সী আমির হোসেন আমু অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে থাকলে সেটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও আলোচনার দাবি রাখে।

তার বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ। তিনি দাবি করেন, ২০১৪ সালের পর আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে ছিলেন। তোফায়েল আহমেদ কিংবা আমির হোসেন আমুর মতো নেতারা রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় ছিলেন বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যারা দীর্ঘদিন সক্রিয় ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ কতটা প্রয়োজনীয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য মূলত বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি জটিল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান—এ নীতি গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি। তারা বলেন, বয়স, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবদানের প্রশ্নকে পুরোপুরি উপেক্ষা করলে বিচারব্যবস্থার মানবিক দিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উন্নত অনেক গণতান্ত্রিক দেশেও প্রবীণ অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা যেমন গৃহবন্দি রাখা, চিকিৎসাসহ জামিন বা বিশেষ মানবিক বিবেচনার নজির রয়েছে।

আইনজ্ঞদের মতে, যদি কারো বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে হবে। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই দীর্ঘ সময় আটক রাখা সবসময় ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষত প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আদালত মানবিক বিবেচনা নিতে পারেন। তারা মনে করেন, মানবিকতা যেন আইনের শাসনকে দুর্বল করার হাতিয়ার না হয়।

অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিশোধমূলক রাজনীতির সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। ক্ষমতার পালাবদলের পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রবীণ নেতাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি জনমনে বাড়তি আবেগ তৈরি করে, কারণ তারা ইতিহাস ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণও আলোচনায় এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রবীণ নেতাদের অনেক ক্ষেত্রেই বয়স ও অবদানের ভিত্তিতে মানবিক সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশেও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের বয়স্ক নেতাদের বিচার চললেও কারাবাসের বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বিপরীত উদাহরণও আছে। অনেক দেশেই মানবতাবিরোধী অপরাধ বা দুর্নীতির অভিযোগে প্রবীণ নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যেখানে বয়সকে দায়মুক্তির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

বাংলাদেশেও বিষয়টি নিয়ে জনমত বিভক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহিন রহমান লিখেছেন, “যে মানুষগুলো স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, তাদের শেষ বয়সে জেলে দেখতে খারাপ লাগে। বিচার হোক, কিন্তু মানবিক আচরণও দরকার।” অন্যদিকে নেটিজেন তানিয়া সুলতানা মন্তব্য করেন, “আইনের চোখে সবাই সমান। প্রবীণ হলেই কেউ দায়মুক্তি পেতে পারেন না।”

আরেকজন ব্যবহারকারী রাকিব হাসান লিখেছেন, “রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে এই বিতর্ক চলতেই থাকবে।” আবার সুমাইয়া নওরীন নামে একজন মন্তব্য করেন, “মানবিক বিবেচনা জরুরি, কিন্তু সেটা যেন বিচারকে প্রভাবিত না করে।”

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিতর্কের পেছনে দুটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, মানবিক বিবেচনা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সীমারেখা কোথায়? কারণ কোনো প্রবীণ নেতার অবদান ও বয়সকে সম্মান জানানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আইনের শাসন বজায় রাখাও সমান জরুরি।

ফজলুর রহমানের বক্তব্যে সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে দায়মুক্তি দেওয়ার আহ্বান ছিল না; বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপূর্ব দীর্ঘ কারাবাস ও মানবিক আচরণ নিয়ে। তার এই অবস্থান একদিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ইঙ্গিত করে, অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার অভাবকেও সামনে আনে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের আলোচনার ইতিবাচক দিক হলো—এটি বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। তবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, যেন এই বিতর্ক দলীয় অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি নীতিগত আলোচনায় পরিণত হয়।

রাজনীতিতে প্রবীণ নেতারা শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি নন; তারা দেশের ইতিহাস, আন্দোলন ও রাষ্ট্রগঠনের স্মৃতিরও অংশ। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে জনমনে আবেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, আইনের শাসনের প্রশ্নে কোনো ব্যক্তি সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়েই এখন আলোচনায় উঠে এসেছে—মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের ভারসাম্য কোথায় হওয়া উচিত।

ফজলুর রহমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250