২০২৫ সালের আগস্টের শুরুতে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এসেছে—একটি ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’, অন্যটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমা। প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৫ই আগস্ট রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করেন বহু প্রতীক্ষিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’। পরে, সেই রাতেই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন—২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রোজার আগেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই দুই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যখন দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আশাবাদের আলো দেখার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তখন বাস্তবতা আমাদের সামনে ভিন্ন ও জটিল চিত্র উপস্থাপন করছে। এই অবস্থাকে ‘আশাবাদ ও বাস্তবতার সংঘর্ষ’ বলে অভিহিত করেছেন দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসনাইন খুরশেদ।
হাসনাইন খুরশেদ ১৯৮৭ সাল থেকে সাংবাদিকতায় যুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি টেলিভিশন ও প্রিন্ট গণমাধ্যমে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি নিজের ইউটিউব চ্যানেল ‘VIEWSROOM’-এ নিয়মিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। গতকাল বুধবার (৬ই আগস্ট) ওই চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় তিনি জুলাই ঘোষণাপত্র ও জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন।
ঘোষণার আশাবাদ এবং বাস্তব চিত্র
গত মঙ্গলবার (৫ই আগস্ট) রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থাপন করেন ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’। গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে এই ঘোষণাপত্র জাতিকে একটি নতুন রাজনৈতিক দিশা দেওয়ার সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
ঘোষণার পর দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এর প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানায়। একইভাবে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষিত জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমা—আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, রোজার আগেই—তাকেও স্বাগত জানায় বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো।
কিন্তু দেশব্যাপী প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ঐক্য কিংবা নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে ওঠার বদলে, দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীরতর হচ্ছে। বিশেষত জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ ঘোষণাকে পরিপূর্ণ বলে মানতে নারাজ। তারা বলছে, ঘোষণাপত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত হয়েছে, যার ফলে এটি একটি অসম্পূর্ণ দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে বিতর্ক
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি উভয়েই জুলাই জাতীয় সনদকে আইনগত ভিত্তি দেওয়ার দাবি তুলেছে। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত এই সনদের ভিত্তিতেই, নইলে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। এনসিপি আরও স্পষ্ট করে বলছে—‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’ বা নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপে জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য।
এই মতপার্থক্য নতুন এক রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে, যেখানে কিছু দল নির্বাচনে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে কিছু দল এখনো শর্তসাপেক্ষে অবস্থান করছে।
তারেক রহমানের আহ্বান: ঐক্যের ডাক
এই দ্বিধা ও দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বুধবার অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক র্যালির শুরুতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেন— ‘রাজনীতিতে মতভেদ থাকবেই। কিন্তু ভিন্ন মত থাকলেও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়া উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে হবে।’
তার এই বক্তব্য বর্তমান সংকট উত্তরণের সম্ভাব্য পথ দেখায়। যদি রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার টেবিলে বসে ভিন্নতা দূর করতে পারে, তাহলে জাতীয় নির্বাচন একটি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক পরিণতি
বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো: নির্বাচন হবে কি না, হলে কীভাবে হবে এবং সব দলের অংশগ্রহণে হবে কি না। দেশের নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং গণমাধ্যম এই নির্বাচনকে ঘিরে নজর রাখছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান না থাকলে ২০২৪ সালের ক্ষমতা হারানো গোষ্ঠীগুলো আবার মাথাচাড়া দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন সাংবাদিক হাসনাইন খুরশেদ। তিনি বলেন— ‘যদি রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়, তাহলে ২৪ সালের পরাজিত শক্তি রাজনৈতিক সুযোগ নিতে পারে। কাজেই এখন দরকার রাজনৈতিক ঐক্য সংহত করা।’
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য, এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে যেতে হলে এখনই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ, সহমর্মিতা এবং সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থে সমঝোতার প্রয়োজন। ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ এবং ‘নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা’ যেন কেবল রাজনৈতিক লিপিবদ্ধতা না হয়ে ওঠে, বরং একটি বাস্তব পথরেখা হয়ে উঠুক—এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।