ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
দুর্জয় রায়
অন্ধকার কারাকক্ষে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু-সংবাদ শোনার পর সাহসী, স্পষ্টভাষী সাংবাদিক আনিস আলমগীর নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেয়েছেন! তার এই কষ্ট নিশ্চয়ই আরও বেড়েছে এ জন্য যে জেলখানার বন্দীদশা তার প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কিছু বলবার বা লিখবার অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছে!
তৎকালীন (১৯৯১-৯৬) প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে তরুণ সাংবাদিক আনিস আলমগীরের অত্যন্ত আনন্দদায়ক, আজীবন গর্বিত বোধ করার মতো কিছু স্মৃতি আছে।
বছর বিশেক আগে আনিস ভাই ও আমি কিছুদিন সহকর্মী ছিলাম। অধুনালুপ্ত ইংরেজি দৈনিক দ্য ইনডিপেনডেন্টে। ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা যৌথবাহিনীর যুদ্ধ কাভার করতে গিয়ে 'ওয়্যার করেসপনডেন্ট' বা 'সমরাঙ্গণ সংবাদদাতা' হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে উঠেন আনিস আলমগীর। ইনডিপেনডেন্ট-এ তিনি ছিলেন ডিপ্লোম্যাটিক রিপোর্টার, আমি জুনিয়র রিপোর্টার। অনেক ব্যক্তিত্বহীন
সিনিয়রকে দেখেছি তারা অকারণে জুনিয়রদের সাথে একটা নাকউঁচু ভাব দেখান। কিন্তু আনিস ভাই আমার বেশ সিনিয়র হলেও কখনো তা জাহির করেননি। তার মধ্যে দেখেছি পরিমিতিবোধ সম্পন্ন দৃঢ় ব্যক্তিত্ব।
অফিসে আমি আর ওনি পাশাপাশি ডেস্কে বসতাম। তাছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের তিনি আমার সিনিয়র ভাই। ফলে তার সাথে আমার বেশ কথাবার্তা হতো।
যুদ্ধক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহ বিষয়ে নানা কথার মাঝে একদিন তিনি জানালেন, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার অফিসে আনিস ভাইকে ডেকেছিলেন। বেগম জিয়া আনিস ভাইয়ের কাছে ইরাকের যুদ্ধ ও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তার সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা বিষয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেন।
খালেদা জিয়া আনিস ভাইয়ের মুখোমুখি বসে খুব আন্তরিকতার সাথে বেশ অনেকটা সময় তার সাথে কথা বলেন, তাকে চা-নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করেন। খালেদা জিয়ার সাথে তার সেই সময়ের অনেকগুলো ছবি তার কম্পিউটারে আমাকে আনিস ভাই দেখালেন।
দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে এমন স্মৃতি যে কারও জন্যই অত্যন্ত আনন্দের, গৌরবের। আনিস ভাইয়ের জন্যও এই স্মৃতি অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহারে খুব ইম্প্রেসড হয়েছিলেন।
আনিস ভাইয়ের সাথে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বিষয়ে কখনো কথা হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে দেখা হওয়ার পর তিনি যদি ধানের শীষের ভোটারে পরিণত হয়ে থাকেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ব্যক্তিত্বহীন, আত্মমর্যাদাবোধহীন, বাটপার শ্রেণির কোনো সাংবাদিক বা অন্য কোনো পেশার কেউ যদি প্রধানমন্ত্রীর সাথে এরকম সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেতেন, তাহলে এটিকে পুঁজি করে কতো কী যে করে ফেলতেন! কিন্তু আনিস ভাই সুবিধা নেওয়ার চিন্তা করা তো দূরের কথা, খুব কাছের কেউ না হলে ঘটনাটি বলতেনও না।
সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সাথে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। অন্য সকলের মতো তারও নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস অবশ্যই আছে। কিন্তু তার রাজনৈতিক বিশ্বাস কখনোই তার পেশাগত দায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারেনি।
ফলে এই নষ্ট ব্যবস্থার দেশে অন্য সকল পেশার মতো সাংবাদিকেরাও যখন দলদাসে পরিণত হয়ে ক্ষমতাবানের পদলেহনের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত, আনিস ভাই তখন নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে সকল অব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে অতীতে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, আনিস ভাই পেশাগতভাবে নিগৃহীত হয়েছেন।
তবে প্রশ্ন করার জন্য, সমালোচনা করার জন্য অতীতে তাকে জেলে যেতে হয়নি, তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। কিন্তু 'ফ্যাসিবাদ-বিরোধী' ড. ইউনুস সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা হলো! গ্রেপ্তার হয়ে তিনি এখন কারাগারের অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন!
আনিস আলমগীর কোনো অন্যায় করেননি, সাংবাদিক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। যেখানে অস্বচ্ছতা দেখেছেন, অনিয়ম দেখেছেন, সেখানে প্রশ্ন করেছেন, সমালোচনা করেছেন। এটাই একজন সৎ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ।
কার কাছে সাংবাদিক আনিস আলমগীরের মুক্তি দাবি করব? দেশে সুশাসন, সুবিবেচনা থাকলে তো তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ারই কথা ছিল না। গ্রেপ্তার হয়ে অন্ধকার কারাকক্ষে বাস করার কথা ছিলো না।
শুনেছি কারাগারে আনিস ভাই নাকি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারি। আজ যদি খালেদা জিয়া বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো আনিস ভাইকে এই বন্দী জীবন, এই দুর্ভোগ সহ্য করতে হতো না।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন