ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক, প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেছেন, খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকলেও ১৫ই আগস্টে তার তথাকথিত জন্মদিন উৎসব উদযাপন করে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাকে সুনির্দিষ্টভাবে কষ্ট দিয়ে গেছেন। একটি মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডকে উপহাস করাই ছিল এই জন্মদিন উদযাপনের তাৎপর্য।
তার মতে, এখানে রুচিহীনতা ও সংবেদনশীলতার চরম ঘাটতিই দৃশ্যমানভাবে পরিলক্ষিত হয়। তারা কী ভেবেছিলেন মিথ্যা জন্মদিন উদযাপনে সমগ্র জাতি এতটাই মগ্ন হয়ে থাকবে যে, তারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার নিষ্ঠুর মর্মান্তিকতা ভুলে যাবে? ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
তিনি বলেন, জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে কাজ করেছে। তিনি তাদের ঘৃণ্য অপরাধের বিচার করতে দেশে ফেরানোর চেষ্টা না করে, বিদেশের মাটিতে তাদের চাকরি অব্যাহত রেখেছেন। এমনকি যখন তাদের একজন দেশে ফিরে সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা ভঙ্গে মদদ দিয়েছিলেন, তখনও তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলে কোনো উদ্যোগ নেননি।
মাহফুজ আনাম বলেন, ১৯৭৫ সালের পর থেকে '৯৬- এই সময়কাল জুড়ে বঙ্গবন্ধুকে ধীরে ধীরে জনসাধারণের নজর থেকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চলতে থাকে। যিনি বাংলাদেশের জন্মের রূপকার তার প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন তো দূরে থাক, ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে ফেলার অনবরত প্রচেষ্টা চলেছে। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিন—২৬শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বরেও উচ্চারণ পর্যন্ত করা হত না বঙ্গবন্ধুর নাম।
তিনি বলেন, এক পর্যায়ে ইতিহাসের বিকৃতি চরম আকার ধারণ করে এবং মনে হচ্ছিল যেন নাৎসি পার্টির প্রোপাগান্ডা বিশারদ গোয়েবলস তার পূর্ণ অশুভ চরিত্র নিয়ে পুনর্জন্ম নিয়েছেন। জিয়াউর রহমানের আমলে হঠাৎ করে বাংলাদেশে লাখো মানুষকে নির্বিচারে হত্যার জন্য দায়ী ও গণহত্যার সূচনাকারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ইতিহাসের বই, স্কুলের পাঠ্য বই ও আনুষ্ঠানিক বর্ণনায় 'হানাদার বাহিনী' হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু হল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে অনেক বীর রয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। অন্যরা হয়তো তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে, কিংবা একাধিক ক্ষেত্রে শীর্ষে পৌঁছতে পেরেছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বীরত্বগাথা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদেরকে একটি দেশ এনে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের সবচেয়ে বড়, উজ্জ্বল এবং প্রাসঙ্গিক নায়ক থেকে মহানায়ক। কিন্তু সেই মহানায়ককে হত্যা করা হয়েছে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম বর্বরতার সঙ্গে।
ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার পুরনো লেখার এ লিংক সম্প্রতি ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তার লেখাটি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ২০২১ সালের ১৪ই আগস্ট ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণ প্রকাশিত হয় 'ট্রিবিউট টু বঙ্গবন্ধু: হাউ টু রিমেম্বার অ্যা হিরো' শিরোনামে। ডেইলি স্টারের ওই পুরনো সংখ্যাটি সুখবর ডটকমের কাছে সংরক্ষিত আছে।
মাহফুজ আনামের লেখা উপসম্পাদকীয়টি প্রকাশিত হওয়ার পরের দিন, ১৫ই আগস্ট বাংলায় সেটির অনুবাদ করে ডেইলি স্টারের বাংলা ডিজিটাল সংস্করণে প্রকাশিত হয় 'বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি: কীভাবে স্মরণ করব জাতীয় বীরকে' শিরোনামে। বাংলা লেখাটির লিংক ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইটে আছে। সামাজিক মাধ্যমে মাহফুজ আনামের কলামের বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা দুটি লিংকই ছড়িয়ে পড়েছে।
মাহফুজ আনাম লেখেন, জিয়াউর রহমান সরকারের সবচেয়ে কলঙ্কজনক কাজটি হচ্ছে, জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলে কোনো উদ্যোগ নেননি। এই অধ্যাদেশটি বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত হত্যাকারীদের সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছে এবং এর ফলশ্রুতিতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে অনেক বছর ধরে আমরা সর্বজনস্বীকৃত এই খুনিদের সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছি।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের নীতি, গণতন্ত্রের মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদের মূলনীতির ওপর আঘাত করা। তারা ইতিহাসকে বিকৃত করতে চেয়েছিলেন এবং একইসঙ্গে সম্ভব হলে আমাদের যা যা অর্জন তাও ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তারা আমাদের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, হত্যাকারীদের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো রকম যোগসূত্র থাকতে পারে না। তারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করতেন না, তারা সমাজতন্ত্রকে বিকৃত করেছেন এবং জাতীয়তাবাদকে তাদের নিজেদের মতো করে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা তাদের মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীতে নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের সময়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু হয়েছিল একটি রেডিও ঘোষণার মাধ্যমে, এ বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চোখে পড়ে। ব্যাপারটি এমন, যেন দৃশ্যপটে জিয়া আসার আগে কিছুই হয়নি। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে কয়েক দশকের সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, সামরিক আইন (মার্শাল ল) বিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন— সব কিছুর অবদানকে মুছে ফেলা, বিকৃত করা ও অবমাননা করা শুরু হয়। কারণ এর সবগুলোতেই ছিল বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা।
মাহফুজ আনাম উপসম্পাদকীয়তে বলেন, জেনারেল এইচ এম এরশাদ এতটা খোলামেলাভাবে না হলেও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের তুষ্ট রাখার ক্ষেত্রে জিয়ার সরকারের একই ধরণের নীতি অনুসরণ করে গেছেন। করদাতাদের অর্থে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়ানো খুনিদের বিচারের আওতায় আনার কোনো চেষ্টাই করেননি তিনি। এমনকি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলেরও চেষ্টা করেননি।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিলেন তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তাদের কার্যক্রমে মনে হতো, ৭ই মার্চে কেউ কোনো ভাষণই দেননি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ সমগ্র জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে (প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে এটি আমাদের দৈনন্দিন অনুপ্রেরণার উৎস ছিল)। ভাষণটি এখন বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অংশ।
খবরটি শেয়ার করুন