ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলন দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দেয়। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন নতুন দল ও নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে, তেমনি বিভিন্ন নামে অসংখ্য নাগরিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করে। বিশেষ করে ‘জুলাই’, ‘গণ-অভ্যুত্থান’, ‘নাগরিক’ বা ‘সংস্কার’ শব্দ ব্যবহার করে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোকে ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। এসব সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থান, মতাদর্শ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে জনপরিসরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট আনিস আলমগীর। সম্প্রতি কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়ার ‘কালের সংলাপ’ টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘জুলাই’ নাম ব্যবহারকারী অধিকাংশ সংগঠন কার্যত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক বলয়ের অংশ হিসেবে কাজ করছে বলে তার পর্যবেক্ষণ।
আনিস আলমগীর বলেন, ‘জুলাই নাম দিয়ে যত সংগঠন আছে, বেশিরভাগই জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত। এরা বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কিত না এবং এরা নিজেদের ফেসবুক পেজে বিএনপিকে গালাগাল করে।’ তিনি আরও বলেন, এনসিপি আত্মপ্রকাশের সময় নতুন প্রজন্মের রাজনীতির একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখা দিলেও পরবর্তী সময়ে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তার মূল্যায়ন বদলে যায়।
তার ভাষায়, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়েছিল একটা ফ্রেশ মাইন্ডে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের ছাত্রসমাজ যে ভূমিকা রেখেছে, তাদের দিয়ে নতুন একটা সমাজ, নতুন ধরনের রাজনীতির চিন্তাধারা থেকেই এ দলটার উৎপত্তি হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল যে কার্যত এরা ওদেরই (জামায়াত) বি-টিম। এদের রাজনীতি শুরু থেকেই এদের বেশিরভাগ লোকজন যারা সামনে ছিল তারা একসময় ছাত্রশিবির করত কিংবা জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে জড়িত ছিল।’
আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আরও বলেন, ‘এনসিপি সত্যিকার অর্থেই জামায়াতের একটা বি-টিম। জামায়াত এ ধরনের বি-টিম আরো রেখেছে। কতগুলো সামাজিক সংগঠন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নাম দিয়ে যত সংগঠন আছে, সবগুলো কিন্তু এক জায়গায় জামায়াতে ইসলামীর আরেকটা উইং। এগুলো নানা ফিল্টার করা বুঝতে পারবেন না যে এগুলো আসলে জামায়াতের কি না।’
তিনি যোগ করেন, ‘এদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হলে ও এদের কার্যক্রম ফলো করলে বোঝা যাবে জুলাই নাম দিয়ে সবগুলোই জামায়াতের উইং হিসেবে কাজ করছে।’ আনিস আলমগীরের এসব মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে বা তারা নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছে।
জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিসরে একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা ছিল নতুন নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন মতাদর্শের কর্মীরা একাধিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। এসব সংগঠনের অনেকগুলোর নামের সঙ্গে ‘জুলাই’ শব্দটি যুক্ত ছিল, যা আন্দোলনের প্রতীকী স্মৃতি বহন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংগঠনের লক্ষ্য ও আদর্শ এক নয়। কিছু সংগঠন কেবল নাগরিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে, কিছু সংগঠন সংস্কারভিত্তিক রাজনীতির কথা বলেছে, আবার কিছু সংগঠন পরবর্তীকালে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।
তবে একই সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন অভিযোগও উঠতে থাকে যে, এসব সংগঠনের কিছুতে বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ধারা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক বা বর্তমান সমর্থকদের উপস্থিতি দৃশ্যমান। সমালোচকদের মতে, আন্দোলনের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মতাদর্শের কর্মীরা নতুন পরিচয়ে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বক্তব্য, কোনো ব্যক্তির অতীত রাজনৈতিক পরিচয় পুরো সংগঠনের বর্তমান আদর্শ নির্ধারণ করে না।
এনসিপির আত্মপ্রকাশের সময় নিজেদের একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। দলটির নেতারা বারবার বলেন, তারা প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চান।
কিন্তু দলটি আত্মপ্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই এর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিভিন্ন ইস্যুতে নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সমালোচকদের অভিযোগ, দলটির কিছু নেতার অতীত ছাত্ররাজনীতি বা ইসলামপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে জনপরিসরে প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি সামনে এনে অনেকে দাবি করেন, এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই ডানমুখী হয়ে উঠছে।
আনিস আলমগীর তার আলোচনায় মূলত এই বিষয়টিকেই সামনে এনেছেন। তার মতে, শুরুতে যে রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে এনসিপির কর্মকাণ্ড সে প্রত্যাশার সঙ্গে মিল রাখেনি। তবে এনসিপির নেতারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তাদের দল কোনো রাজনৈতিক দলের প্রক্সি বা অঙ্গসংগঠন নয় এবং তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবেই গ্রহণ করে।রাজনীতিতে অতীতে বহুবার দেখা গেছে, বিভিন্ন মতাদর্শের ব্যক্তি একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে একত্রিত হয়েছেন। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সাবেক কর্মী পরবর্তীকালে অন্য দল বা নতুন সংগঠনে যোগ দেওয়াও অস্বাভাবিক নয়। ফলে কোনো সংগঠনের কয়েকজন নেতার অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পুরো সংগঠনের বর্তমান চরিত্র নির্ধারণ করা সহজ নয়।
তবে এটিও সত্য যে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আদর্শ, বক্তব্য, কর্মসূচি এবং বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিভিন্ন মূল্যায়ন করে থাকেন। আনিস আলমগীরের মন্তব্যও সেই ধরনের একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, যা নিয়ে একমত ও ভিন্নমত—দুই ধরনের অবস্থানই জনপরিসরে বিদ্যমান।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াতও নতুন বাস্তবতায় নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও দৃশ্যমানভাবে পরিচালনা করতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা দলটি নতুন পরিস্থিতিতে প্রকাশ্য কর্মসূচি, মতবিনিময় সভা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ বাড়ায়। একই সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনা শুরু হয় যে, জুলাই আন্দোলনের সময় বা পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা কিছু প্ল্যাটফর্মে জামায়াতের সাবেক বা বর্তমান সমর্থকদের উপস্থিতি বেড়েছে।
এখানেই আনিস আলমগীরের পর্যবেক্ষণটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। তার মতে, ‘জুলাই’ নাম ব্যবহারকারী অনেক সংগঠন এবং এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে জামায়াতের সঙ্গে তাদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সংগঠনের বক্তব্য, কর্মসূচি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং রাজনৈতিক অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। নতুন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো তাদের অবস্থান তুলে ধরতে ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।
আনিস আলমগীর তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, তিনি বিভিন্ন সংগঠনের ফেসবুক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেই তার এই মূল্যায়নে পৌঁছেছেন। তার দাবি, ‘জুলাই’ নামধারী অনেক সংগঠনের প্রচারণায় বিএনপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সমালোচনা দেখা যায়, অথচ জামায়াতের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নমনীয় অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
খবরটি শেয়ার করুন