ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় ভারত। দুই দেশের মধ্যে চালু থাকা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই দ্বিপক্ষীয় সব বিষয় নিয়ে আলোচনায় নয়াদিল্লি প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এমন বক্তব্যের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে দুই দেশ আলোচনা করছে। তবে এখনো সফরের কোনো তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।
মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারত আগেও জানিয়েছে যে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক চায়। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কাঠামোর ভেতর থেকেই সব দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ভারত প্রস্তুত। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পর্ককে ইতিবাচক ও গঠনমূলক দিকে এগিয়ে নেওয়াই নয়াদিল্লির অভিপ্রায়।
জয়সোয়ালের এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে ভারত আনুষ্ঠানিক সম্মতিও দিয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভারত আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে সম্মতি দিয়েছে। তিনি বর্তমান হাইকমিশনার মো. রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন। রিয়াজ হামিদুল্লাহকে জেনেভায় জাতিসংঘ দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আসাদ আলম সিয়াম ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার ই-মেইলের মাধ্যমে আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে আনুষ্ঠানিক সম্মতির কথা জানিয়েছে ঢাকার একাধিক গণমাধ্যমকে। এর আগে এক মাসের বেশি সময় ধরে তার নিয়োগের অনুমোদন আটকে থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রিন্টে। শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লির সম্মতি পাওয়ার পর তার নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগের বিষয়ে জয়সোয়ালের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এটি কি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত? জবাবে তিনি সরাসরি নিয়োগটির ব্যাখ্যা না দিয়ে ভারতের সামগ্রিক অবস্থান তুলে ধরেন। অর্থাৎ, নয়াদিল্লি সম্পর্ককে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী করতে চায়—এটিই তিনি স্পষ্ট করেছেন। নিয়োগটিকে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার নির্দিষ্ট সংকেত হিসেবে তিনি ঘোষণা করেননি।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে সাম্প্রতিক সবচেয়ে নির্দিষ্ট তথ্য এসেছে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ঢাকা ও নয়াদিল্লি তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধের সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা করছে। দুই দেশের কূটনীতিকেরা সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে কাজ করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমানকে ভারতের পক্ষ থেকে এর আগে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আগস্টে সম্ভাব্য একটি সফরের আলোচনা হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরে সেপ্টেম্বরের ১২ ও ১৩ তারিখ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও তারেক রহমান অংশ নেননি। ভারত তাকে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে সম্মেলনের একটি পর্বে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের মতো ছিল না।
সেপ্টেম্বরে সেই সফর না হওয়ার পর এখন নভেম্বরকে সামনে রেখে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এটিকে চূড়ান্ত সফরসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ব্রিফিংয়ে জয়সোয়ালকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারেক রহমানের নভেম্বরের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা কতদূর এগিয়েছে। তিনি এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য না দিয়ে বলেন, কিছু বলার থাকলে পরে জানাবেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার পর আগস্টে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আর হয়নি। ঢাকা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও ভারতের কাছে তুলে ধরেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনার মধ্যেও শেখ হাসিনার অবস্থান ও তার প্রকাশ্য বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করছে।
ভারতের সাবেক বাংলাদেশ হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। তিনি দুই দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্বার্থের বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি পানি বণ্টনসহ অমীমাংসিত বিষয় এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে সম্পর্কের জটিলতার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বক্তব্য অবশ্য ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। তিনি সাবেক কূটনীতিক হিসেবে নিজের বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তার বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে না; সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের একটি সফর হলেও আলোচনার পরিধি শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই।
এর মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিবের নয়াদিল্লিতে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগে নতুন একটি ধাপ তৈরি করছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, আসাদ আলম সিয়াম শিগগিরই নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব নিতে পারেন। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকাও আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে নয়াদিল্লির অনুমোদনের খবর দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ চলতি মাসের শেষে জেনেভায় জাতিসংঘের দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। ফলে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামের দায়িত্ব নেওয়া দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি নিয়মিত পরিবর্তন হলেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
সম্পর্কের এই নতুন পর্যায়ে সামরিক যোগাযোগের একটি ঘটনাও সামনে এসেছে। ভারতের বিমানবাহিনী আয়োজিত বহুপক্ষীয় বিমান মহড়া ‘তরঙ্গ শক্তি-২৬’-এ বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত রাজস্থানের যোধপুর বিমানঘাঁটি ও আশপাশের ঘাঁটিতে মহড়াটি হবে। এতে ভারত, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, শ্রীলঙ্কা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানবাহিনী অংশ নেবে। আরও ৩২টি দেশ পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবে। বাংলাদেশের সি-১৩০ জে বিমান মহড়ায় অংশ নেবে।
২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত ‘তরঙ্গ শক্তি’র প্রথম পর্বে বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিল। এবার বাংলাদেশের বিমানবাহিনী নিজস্ব বিমান নিয়ে অংশ নিচ্ছে। ভারতের বিমানবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার মার্শাল আশুতোষ দীক্ষিত বলেছেন, মহড়াটির লক্ষ্য হলো কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নেওয়া, বিভিন্ন দেশের বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা।
তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে থাকা তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠক হবে কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত। মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয়সোয়াল বলেন, এ ধরনের কোনো বৈঠক সম্পর্কে তার কাছে তখনো তথ্য নেই। ফলে নিউইয়র্কে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হবে কি না, সে বিষয়ে আপাতত কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কয়েকটি নতুন যোগাযোগের ক্ষেত্র স্পষ্ট হচ্ছে। আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি এসেছে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য নভেম্বরের তারিখ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ভারতের বহুপক্ষীয় বিমান মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে বলছে, তারা ঢাকার সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক চায় এবং বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে সব দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।
তবে সম্পর্কের বড় অমীমাংসিত বিষয়গুলো এখনো রয়ে গেছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, পানি বণ্টন, সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। তারেক রহমানের ভারত সফরের তারিখও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে নভেম্বরের সম্ভাব্য সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা গেলেও সফরটি বাস্তবায়ন হওয়া এবং সেখানে কী কী বিষয়ে আলোচনা বা সমঝোতা হয়, সেটিই পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
খবরটি শেয়ার করুন