বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে ভাষণ বলে ইউনূসকে নিয়ে মিথ্যাচার *** ফুটেজে সম্পৃক্ততা পেয়ে সেই কিশোরকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ *** বারিধারায় গাড়িচাপায় শ্রমিক নিহত: গতকাল আটক সেই কিশোরের নাম নেই মামলায় *** আওয়ামী লীগ আমলের ‘দুর্নীতির’ তদন্তের সুপারিশ সংসদীয় কমিটির *** শেখ হাসিনার ষড়যন্ত্রে সায় দিচ্ছে গুপ্ত বাহিনী: রিজভী *** আগেভাগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ঝাঁপ শুরু, ট্রাম্পের পর কে *** মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এআই, জাতিসংঘে প্রযুক্তি নেতাদের সতর্কবার্তা *** শ্রীলঙ্কায় জঙ্গিদের ইস্টার সানডে হামলা—মূল হোতা নাউফার মৌলভির ২২০ বছর কারাদণ্ড *** সরকারি সব কমিটি থেকে সরানো হচ্ছে আওয়ামীপন্থীদের *** লঞ্চের ভাড়া বাড়ল, রেলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে ভাষণ বলে ইউনূসকে নিয়ে মিথ্যাচার

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১০:২৭ অপরাহ্ন, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে নোবেলজয়ী ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্য নিয়ে দেশের কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। যা যথারীতি মিথ্যাচার। প্রতিবেদনগুলোতে তাকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণদাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, তিনি সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক বিতর্কে বক্তব্য দিয়েছেন।

কিন্তু জাতিসংঘের নিজস্ব নথি ও অনুষ্ঠানসূচি বলছে, ২১ সেপ্টেম্বর ইউনূস যে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি ছিল সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের একটি পার্শ্ব-আয়োজন। সাধারণ পরিষদের মূল সাধারণ বিতর্ক শুরু হয়েছে ২২ সেপ্টেম্বর।

জাতিসংঘের ওয়েব টেলিভিশনের অনুষ্ঠানসূচিতে ২১ সেপ্টেম্বরের ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ অনুষ্ঠানকে সরাসরি ‘সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আয়োজন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এবারের অনুষ্ঠানটি ছিল এ ধরনের আয়োজনের ১১তম সংস্করণ। এতে সামাজিক ব্যবসা, তরুণ নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের প্রকাশিত নথিতেও একই তথ্য পাওয়া যায়। ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষ-১-এ ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ বিষয়ে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সেখানে বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের শুরুতেই ইউনূস, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং অন্য অতিথিদের উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে অনুষ্ঠানটিকে সাধারণ পরিষদের মূল সাধারণ বিতর্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

জাতিসংঘের অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বরের ওই আয়োজনে ইউনূস ছিলেন অন্যতম প্রধান বক্তা। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্যেও তার নামের সঙ্গে তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানের নাম রয়েছে। অনুষ্ঠানটি নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।

অর্থাৎ, ইউনূস জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বক্তব্য দিয়েছেন—এ তথ্য সঠিক। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বরের ওই বক্তব্যকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের ভাষণ বলা ঠিক নয়। সাধারণ পরিষদের মূল সাধারণ বিতর্কের আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হয়েছে ২২ সেপ্টেম্বর। রয়টার্স ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এতে বক্তব্য দেবেন।

২২ সেপ্টেম্বরের মূল অধিবেশন এবং ২১ সেপ্টেম্বরের পার্শ্ব-আয়োজনের পার্থক্যটি জাতিসংঘের অনুষ্ঠানসূচি থেকেই স্পষ্ট। ২১ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানকে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ হিসেবে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ বিতর্কের দিনগুলোকে সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশন হিসেবে আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শুধু জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ভেতরে কোনো অনুষ্ঠান হয়েছে বলেই সেটিকে সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের ভাষণ বলা যায় না।

দেশীয় সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে অবশ্য বিষয়টি তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে এসেছে। প্রতিবেদনের শিরোনামেই বলা হয়েছে, ইউনূস ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রতিবেদনের শুরুতে তাকে ‘উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আয়োজনে’ বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেইলি নিউ নেশন-এর প্রতিবেদনেও ২১ সেপ্টেম্বরের আয়োজনকে ‘সাইড ইভেন্ট’ বা পার্শ্ব-আয়োজন বলা হয়েছে। সেখানে ইউনূসের বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের মন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়।

নিউইয়র্কে অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন লেখকের ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানটি ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ‘পাশাপাশি’ অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আয়োজন ছিল। সেখানে কূটনীতিক, নোবেলজয়ী, মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

তবে বিভ্রান্তির জায়গাটি তৈরি হয়েছে অনুষ্ঠানের মর্যাদা ও সাধারণ পরিষদের অধিবেশন—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখানোর কারণে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে একই সময়ে বহু ধরনের বৈঠক, আলোচনা, সম্মেলন ও পার্শ্ব-আয়োজন হয়। এসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। কোনো অনুষ্ঠানে সাধারণ পরিষদের সভাপতি বা কোনো রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত থাকলেও সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের অংশ হয়ে যায় না।

২১ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে ইউনূস কী বলেছেন, সেটিও আলাদা বিষয়। সেখানে তিনি ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক ব্যবসা, তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছরের যাত্রা, গ্রামীণ আমেরিকা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন।

এ ধরনের পার্শ্ব-আয়োজনে ইউনূসের অংশগ্রহণ নতুন নয়। তার প্রতিষ্ঠিত ইউনূস সেন্টারের ওয়েবসাইটেও আগের বছরগুলোর একই ধরনের আয়োজনের তথ্য রয়েছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনের পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসা, তরুণ সমাজ ও প্রযুক্তি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি অনুষ্ঠানে ইউনূস বক্তব্য দিয়েছিলেন। ইউনূস সেন্টারের ভাষ্যেও সেটিকে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ‘পাশাপাশি’ অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠান বলা হয়েছিল।

এ কারণে ২০২৬ সালের ঘটনাটিকে শুধু ‘জাতিসংঘে ইউনূসের ভাষণ’ বললে পুরোপুরি ভুল না হলেও, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে ইউনূসের ভাষণ’ বললে তা ঘটনাটির প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ২১ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানটি যেখানে পার্শ্ব-আয়োজন হিসেবে জাতিসংঘের ওয়েব টেলিভিশনেই তালিকাভুক্ত, সেখানে সেটিকে সাধারণ বিতর্কের ভাষণ হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইউনূসকে নিয়ে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিভ্রান্তির নজির আগেও দেখা গেছে। খোদ ইউনূস সেন্টারের বিরুদ্ধেও মিথ্যা দাবি ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ আছে। ২০২৪ সালের মার্চে আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাকু ফোরামে ইউনূসের ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তখন ইউনূস সেন্টার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, তাকে ওই ফোরামে বিশেষ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতেও পুরস্কার গ্রহণের কথা উল্লেখ ছিল। ইউনূস সেন্টার এটিকে ইউনেসকোর পুরস্কার হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

তবে পরে ইউনেসকো এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা আসে। ডেইলি স্টার তখন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, ইউনেসকো ‘ট্রি অব পিস’ নামে কোনো পুরস্কার দেয়নি। ‘বিডিনিউজ২৪ ডটকম’-এর অনুসন্ধানেও বলা হয়, এটি ইসরায়েলি এক ভাস্করের তৈরি শিল্পকর্ম এবং ইউনেসকোর আনুষ্ঠানিক পুরস্কার নয়।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনাটির সঙ্গে ২০২৪ সালের পুরস্কার বিতর্ক এক নয়। তবে দুটি ঘটনাই দেখায়, আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত থাকা অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক মর্যাদা, আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি যাচাই করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর ইউনূস নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আয়োজনে বক্তব্য দিয়েছেন। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল সাধারণ বিতর্ক। তাই ২১ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যকে সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের ভাষণ হিসেবে প্রচার করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক নথির সঙ্গে অসঙ্গতি রয়েছে। ঘটনাটির নির্ভুল বর্ণনা হবে—ইউনূস জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের একটি পার্শ্ব-আয়োজনে বক্তব্য দিয়েছেন, মূল সাধারণ বিতর্কে নয়।

মুহাম্মদ ইউনূস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250