ছবি: সংগৃহীত
ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগর। ওই এলাকার একটি মসজিদ পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ নওয়াজ খানকে। কিন্তু এই দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন অনুতপ্ত নওয়াজ। তার বাবা সানাউল্লাহ খান একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। তিনিও একটি মসজিদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শুরু হয় পরিবারের দুশ্চিন্তা। এবার নওয়াজের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।
চলতি মাসের শুরুতে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের পক্ষ থেকে মসজিদসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে চার পাতার একটি ফরম বিতরণ করা হয়। এর শিরোনাম ছিল—‘মসজিদের প্রোফাইলিং’। কিন্তু ভারত সরকারের এই উদ্যোগ কাশ্মীরের মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে একধরনের উদ্বেগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, এর মাধ্যমে সরকার তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে চাইছে।
প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে জম্মু ও কাশ্মীরের এই বাসিন্দারা কি অপরাধী? কেন তাদের ওপর নজরদারি করতে হবে? খবর আল জাজিরার।
ফরমের প্রথম পাতায় মসজিদ-সম্পর্কিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। মসজিদের মতাদর্শিক ঘরানা, প্রতিষ্ঠার সাল, অর্থায়নের উৎস, মাসিক ব্যয়, একসঙ্গে কতজন নামাজ আদায় করতে পারেন এবং যে জমিতে মসজিদটি অবস্থিত, তার মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য।
অন্য তিন পাতায় মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি—ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ অন্যদের ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, পাসপোর্ট, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য। আরও জানতে চাওয়া হয়েছে, তাদের কোনো আত্মীয় বিদেশে থাকেন কি না, তারা কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, এমনকি মোবাইল ফোনের মডেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডিও।
একই ধরনের ফরম জম্মু ও কাশ্মীরের মাদ্রাসা পরিচালকদের কাছেও পাঠানো হয়েছে। শ্রীনগরের জওহরনগর এলাকায় একটি মুদিদোকানে বসে আল-জাজিরাকে নওয়াজ খান বলেন, এখানে শান্তিতে থাকার সুযোগ নেই। প্রায়ই কোনো না কোনো ফরম পূরণ করতে বলা হয়। কিন্তু এবার যে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তা অস্বাভাবিক।
নওয়াজ বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না, পুলিশের এত ব্যক্তিগত তথ্যের কী প্রয়োজন। কাশ্মীরের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের তথ্য সংরক্ষণ আমাদের পরিবারের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এটি সাধারণ কোনো জরিপ নয়, বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জোট মুতাহিদা মজলিশ-ই-উলেমা (এমএমইউ) মসজিদের প্রোফাইলিংয়ের বিরোধিতা করে একে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, মসজিদ হলো পবিত্র স্থান। এখানে ইবাদত ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এর অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিষয়গুলো এভাবে খুঁটিয়ে দেখার কোনো অধিকার রাষ্ট্রের নেই।
শ্রীনগরের লাল বাজার এলাকার এক মসজিদের ইমাম হাফিজ নাসির মীর জানান, তিনি ফরমটি পেলেও এখনো পূরণ করেননি। যদি এটা শুধু কাগজপত্রের ব্যাপার হতো, তাহলে তারা এত তথ্য চাইত না।
ইমাম হাফিজ নাসির বলেন, বিদেশে থাকা আত্মীয়দের তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এগুলো পারিবারিক বিষয়। ভবিষ্যতে এই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ আছে।
কাশ্মীর অঞ্চলটি ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই দাবি করে আসছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে দুই দেশ এই অঞ্চল নিয়ে তিনটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। চীনও কাশ্মীরের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ কাশ্মীরকে আংশিক স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। তবে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এটি বাতিল করে অঞ্চলটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেয়—জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ।
খবরটি শেয়ার করুন