ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাতিজা শামস এস্কান্দার ত্রিশ বছরের বেশি সময় আগে তার ওপর হওয়া হামলার ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক নঈম নিজামের বিরুদ্ধে ‘বিকৃত ও খণ্ডিত’ তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, একটি ‘বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক বয়ান’ তৈরির লক্ষ্যে ঘটনার মূল তথ্যগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নঈম নিজামের সাম্প্রতিক একটি ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে কথা বলেন ইসলামিক টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস এস্কান্দার। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা, পরে ইসলামিক টিভিতে হামলা এবং সম্প্রচার বন্ধের বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধান কৌঁসুলির আমন্ত্রণে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
নঈম নিজাম তার পোস্টে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বেশ কিছু কথা বলেন। শামসের ওপর হামলার ঘটনার পর তার বাবা ও খালেদা জিয়ার ভাই প্রয়াত মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দারের বাড়িতে শেখ হাসিনার যাওয়ার বিষয়টি ওই ফেসবুক পোস্টে উঠে আসে।
পোস্টে ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনামের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়, তিনি সেদিন শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম আরও দাবি করেন, মাহফুজ আনামের পরামর্শে সেই বৈঠকের ছবি ও রেকর্ড নেওয়া হয়েছিল।
ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় শামস বলেন, ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা অবশ্যই তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তবে মাহফুজ আনামের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ওই সফরের সময় সম্পাদক (মাহফুজ আনাম) শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন না।
পোস্টটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে শামস বলেন, তিনি (নঈম নিজাম) দেশের অন্যতম নামি সংবাদপত্রের সম্পাদকের (মাহফুজ আনাম) বিষয়েও ভুল তথ্য ছড়িয়েছেন। যেহেতু তিনি নিজেও একজন সম্পাদক, তাই কোনো কিছু প্রকাশের আগে তার তথ্যগুলো সঠিকভাবে যাচাই করা উচিত ছিল।
নঈম নিজামের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করেই সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন শামস এস্কান্দার। এই ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেসব বয়ান প্রচার করা হচ্ছে সেগুলোকে ‘ভুল ও অতিরঞ্জিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
তিনি জানান, ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে ওই ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১০ বছর। তিনি তখন স্কলাস্টিকা স্কুলের শিক্ষার্থী। তখন তিনি তার ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নিয়মিত ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর এলাকা দিয়ে যাতায়াত করতেন।
শামস বলেন, গাড়িটি যখন ধানমণ্ডি ৩২ অতিক্রম করছিল, তখন সেখানে একটি ব্যারিকেড ছিল। গাড়িটি থামার পর সেখানে থাকা কিছু লোক, যাদের ছাত্রলীগ কর্মী বলে মনে করি, তারা গাড়িটি চিনতে পেরে আমাদের টার্গেট করে।
তিনি অভিযোগ করেন, তাকে এবং ড্রাইভারকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে বের করে লাঞ্ছিত করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমার শার্ট ছিঁড়ে ফেলে, ড্রাইভারকে মারধর করে এবং আমাকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়।’
শামস দাবি করেন, সেখানে তাকে কয়েক ঘণ্টা ধরে গালিগালাজ এবং মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়। তিনি বলেন, ‘তারা আমার পরিবারকে নিয়ে গালিগালাজ করে এবং আমার সাথে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করে।’ শামস জানান, স্কুল থেকে সময়মতো না ফেরায় বাড়ির লোকজন তাকে খুঁজতে শুরু করে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
নঈম নিজামের ফেসবুক পোস্টের সমালোচনা করে শামস বলেন, এখানে ‘১০ বছরের একটি শিশুর ওপর নির্যাতনের’ বিষয়টি উপেক্ষা করে ঘটনাটিকে ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে আংশিক’ উপস্থাপন করা হয়েছে।
এর আগে শামসের নেতৃত্বে ইসলামিক টিভির একটি প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান কৌঁসুলির সঙ্গে দেখা করেন। তারা ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার সংবাদ প্রচার এবং পরে চ্যানেলের হামলা সম্পর্কে কৌঁসুলিকে অবহিত করেন। শামস বলেন, তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন এবং টিভি স্টেশনকে প্রমাণ সংরক্ষণের কথা বলেছেন।
শামস অভিযোগ করেন, অভিযানের সময় র্যাব ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা টিভি স্টেশনে হামলা চালায়, যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে এবং জোরপূর্বক সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। তিনি আরও বলেন, বিএনপি ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চ্যানেলটি বন্ধ করা হয়েছিল।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ শামস এস্কান্দারের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন, আবার কেউ পুরোনো রাজনৈতিক ঘটনাকে নতুন করে সামনে আনার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফ মাহমুদ লিখেছেন, “৩০ বছর আগের একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে হলে সেটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যসহ উপস্থাপন করা উচিত। যদি কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেটিও আলোচনায় থাকা প্রয়োজন।”
সাবিহা নওরীন নামে একজন মন্তব্য করেন, “সামাজিক মাধ্যমে এখন অনেক তথ্য আসে, কিন্তু সবকিছুর সত্যতা যাচাই করা হয় না। পরিচিত ব্যক্তিদেরও আরও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।”
তানভীর হোসেন নামে একজন লিখেছেন, “পুরোনো রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তির বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।”
অন্যদিকে রুবাইয়াৎ কবির মন্তব্য করেন, “অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে আংশিক তথ্য নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। ফলে মানুষ পুরো ঘটনার বদলে একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়েই আলোচনা শুরু করে।”
মেহেদি হাসান জয় নামে আরেকজন লিখেছেন, “ঘটনাটি নিয়ে যদি বিতর্ক থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নথিপত্রের ভিত্তিতে পরিষ্কার ব্যাখ্যা সামনে আসা উচিত।”
গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বহু বছর আগের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত ঘটনার ক্ষেত্রে স্মৃতিভিত্তিক বর্ণনায় পার্থক্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একই ঘটনার একাধিক বয়ান থাকতে পারে। তবে যখন সেটি জনপরিসরে আসে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে, তখন তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।
তাদের মতে, বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যম দ্রুত জনমত তৈরি করে। ফলে আংশিক তথ্য বা অসম্পূর্ণ বর্ণনা অনেক সময় ভুল ধারণাও তৈরি করতে পারে। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নথি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খবরটি শেয়ার করুন