ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কেউ ছবিটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন। কেউ বলেছেন, ছবিতে ট্রাম্পের অবয়ব বসানো হয়েছে। আবার কেউ দাবি করেছেন, তারেক রহমান ট্রাম্পের কার্ডবোর্ডের কাটআউটের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ডিসেন্টের প্রতিবেদন মতে, একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে শুধু বাংলাদেশের ছবি নিয়ে নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে আয়োজিত সংবর্ধনায় বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের তোলা বেশ কয়েকটি ছবিতে তাকে প্রায় একই ভঙ্গিতে দেখা গেছে। কসোভো, আলবেনিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া ও রোমানিয়ার নেতাদের সঙ্গে ছবিগুলোতে ট্রাম্পের হাসি, শরীরের অবস্থান এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে রাখার ভঙ্গিতে বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে বলকান অঞ্চলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
৩ অক্টোবর, শনিবার নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছবিটি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসা বিশ্বনেতা ও তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে ট্রাম্পের দেওয়া সংবর্ধনায় তিনি অংশ নেন। ছবির উৎস হিসেবে হোয়াইট হাউসের নাম উল্লেখ করা হয়।
এরপর ‘ইনফো বাংলা’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ছবিটি প্রকাশ করে দাবি করে, তারেক রহমান ট্রাম্পের ‘ফটো কাটআউটের’ সঙ্গে ছবি তুলেছেন। অরণ্য আবীর নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ধরনের দাবি করা হয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তির কথা উল্লেখ করে তিনি জানতে চান, ছবিটি কেউ যাচাই করেছেন কি না এবং ফ্যাক্টচেকারদের অবস্থান কী।
এর মধ্যেই মীর জাহান নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, ছবিটি সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি। ছবিটি অনুষ্ঠান হওয়ার বেশ কিছুদিন পর প্রকাশ পাওয়াকেও ওই দাবির পক্ষে সন্দেহের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। দিগন্ত, ট্যাম্পুস্ট্যান্ড ও বসু বাপ্পাদিত্ত নামের আরও কয়েকটি পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকেও ছবি নিয়ে পোস্ট করা হয়।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত অন্য ছবিগুলো সামনে আসার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তি, আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা, উত্তর মেসিডোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হ্রিস্তিয়ান মিৎসকোস্কি এবং সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের সঙ্গে ট্রাম্পের আলাদা ছবিতে তার অবস্থান প্রায় একই। প্রতিটি ছবিতে অতিথি বদলেছে। কিন্তু ট্রাম্পকে প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। মুখে একই ধরনের হাসি। ডান হাত সামনের দিকে। বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচু।
কসোভোর ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান হিব্রিড ডট ইনফো বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কুর্তি, রামা, মিৎসকোস্কি ও ভুচিচের সঙ্গে তোলা ছবিগুলোতে ট্রাম্পের শরীরের অবস্থান খুব কাছাকাছি। মুখের অভিব্যক্তি ও ডান হাতের অবস্থানেও মিল রয়েছে। তবে সব ছবি হুবহু এক নয়। বাঁ হাতের অবস্থান এবং হাসিতে পার্থক্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, হাইভ মডারেশন ব্যবহার করে পরীক্ষা চালিয়ে আলোচিত বলকান নেতাদের ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কসোভোর সংবাদমাধ্যম কোহা এই মিলের একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবর্ধনায় ট্রাম্প নির্দিষ্ট একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিভিন্ন দেশের নেতারা একে একে তার পাশে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ছবি তুলেছেন। একই জায়গা, একই পটভূমি এবং প্রায় একই ক্যামেরার কোণ ব্যবহারের কারণে ছবিগুলোতে ট্রাম্পের অবস্থান কাছাকাছি দেখা গেছে। কোহার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউসের নির্দিষ্ট আলোকচিত্র ছাড়া অন্য কারও ছবি তোলার অনুমতি ছিল না।
কসোভোর সংবাদমাধ্যম কোসেভও একই তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে, নিউইয়র্কে ট্রাম্পের আয়োজিত সংবর্ধনাটি ছিল কঠোরভাবে সংগঠিত প্রটোকলভিত্তিক অনুষ্ঠান। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ২২ সেপ্টেম্বর লোটে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেতাদের সংবর্ধনায় অংশ নেন। সেখানে নির্দিষ্টভাবে ছবি তোলার ব্যবস্থা ছিল।
রোমানিয়ার ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২ অক্টোবর রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুশোর দান তার সঙ্গী মিরাবেলা গ্রাদিনারুর সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ছবি প্রকাশ করেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে, ছবির ট্রাম্প আসল ব্যক্তি কি না। রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় পরে বিষয়টি পরিষ্কার করে। তারা জানায়, ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাস্তব ছবি। এটি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় আয়োজিত সংবর্ধনায় হোয়াইট হাউসের সরকারি আলোকচিত্রীর তোলা।
রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে শুধু হোয়াইট হাউসের সরকারি আলোকচিত্রী প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন। পরে ছবিগুলো প্রক্রিয়াজাত করে একই সময়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিদলের কাছে পাঠানো হয়। ফলে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর বিভিন্ন দেশের নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় একই সময়ে ছবি প্রকাশ পাওয়ার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করা যায়।
রোমানিয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ‘কার্ডবোর্ড ট্রাম্প’-এর ছবি ছড়িয়েছিল, সেটিও আলাদা বিষয়। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় বলেছে, ওই ব্যঙ্গাত্মক ছবি এআই দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ বাস্তব ছবিকে ঘিরে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে পরে ছড়ানো এআই-তৈরি ব্যঙ্গচিত্রকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। রোমানিয়ার সংবাদমাধ্যম হটনিউজও প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এই ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছে।
দ্য ডিসেন্টও বিষয়টি নিয়ে যাচাই করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি সংগ্রহ করে এআই শনাক্ত করার একাধিক টুলে পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে ট্রাম্পের সঙ্গে কসোভো, আলবেনিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া ও সার্বিয়ার নেতাদের আলোচিত ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দ্য ডিসেন্ট আরও জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ট্রাম্পের কার্ডবোর্ড প্রতিকৃতির একটি ছবি আসল নয়। ওপেনএআই ব্যবহার করে ছবিটি তৈরি করা হয়েছিল বলে তাদের যাচাইয়ে উঠে এসেছে।
শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে রাখা ছবিই নয়, একই অনুষ্ঠানের অন্য ছবিতেও ট্রাম্পের ভিন্ন ভঙ্গি দেখা গেছে। হিব্রিড ডট ইনফোর প্রতিবেদনে জর্জিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইরাকলি কোবাখিদজে এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে তোলা ছবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শাহবাজ শরিফের সঙ্গে একটি ছবিতে ট্রাম্পকে বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে রাখতে দেখা যায়। আবার অন্য একটি ছবিতে তাকে শাহবাজের সঙ্গে করমর্দন করতে দেখা যায়। অর্থাৎ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প একই ভঙ্গিতে স্থির ছিলেন—এমন ধারণার সঙ্গেও সব ছবি পুরোপুরি মেলে না।
সার্বিয়ার ভুচিচ, কসোভোর কুর্তি, আলবেনিয়ার রামা ও উত্তর মেসিডোনিয়ার মিৎসকোস্কির ছবিগুলো নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও প্রতিবেদন করেছে। সার্বিয়ার ভ্রেমে লিখেছে, অতিথি, তাদের পোশাক ও অবস্থান বদলালেও ট্রাম্পের মুখের হাসি, ক্যামেরার দিকে তাকানোর ধরন এবং ডান হাতের ভঙ্গি প্রায় একই ছিল। তবে তাদের প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘কার্ডবোর্ড ট্রাম্প’-এর ছবিটি নিজেই এআই দিয়ে তৈরি হওয়ায় সেটি বাস্তব ছবির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
একই ধরনের ছবি তোলার ঘটনা নতুনও নয়। এর আগেও ট্রাম্পের বিভিন্ন কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে অতিথিদের সঙ্গে ছবি তোলার নজির রয়েছে। ২০১৯ সালে বিশ্বনেতাদের একটি সংবর্ধনাতেও ট্রাম্পকে একই ধরনের আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে ছবি তুলতে দেখা যায়। ২০১৭ সালে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ছবি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। পোপের গম্ভীর মুখ নিয়ে নানা মন্তব্যের পাশাপাশি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে পোপের হাসিমুখের ছবিও পাশাপাশি দিয়ে তুলনা করা হয়েছিল।
ফলে তারেক রহমানের সঙ্গে ট্রাম্পের ছবিতে তার একই ধরনের ভঙ্গি দেখা যাওয়াকে একা এআই বা ফটো কাটআউটের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট ক্যামেরা ও সরকারি আলোকচিত্রীর মাধ্যমে ধারাবাহিক ছবি তোলা হলে ছবিগুলোর মধ্যে এমন মিল তৈরি হওয়া সম্ভব। কসোভো ও রোমানিয়ার সংশ্লিষ্ট সূত্রের ব্যাখ্যা এবং দ্য ডিসেন্টের যাচাইও এখন পর্যন্ত আলোচিত বাস্তব ছবিগুলোকে এআই দিয়ে তৈরি বলে প্রমাণ করে না। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ট্রাম্পের কার্ডবোর্ড প্রতিকৃতির ছবিটি আলাদা করে এআই-তৈরি বলে শনাক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ ছবিগুলোর অস্বাভাবিক মিলটি বাস্তব। কিন্তু সেই মিলের ব্যাখ্যা হিসেবে ‘ট্রাম্পের অবয়ব বসানো’ বা ‘কাটআউটের পাশে দাঁড় করানো’—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
খবরটি শেয়ার করুন