রবিবার, ১১ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৫শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী *** জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমির খসরু মারা গেছেন, রাষ্ট্রপতির শোক *** গুলশানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক চলছে *** দুর্গাপূজার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত পুরান ঢাকা *** এক মন্দিরেই ১০১ প্রতিমা, ৪ যুগের কাহিনিতে সাজছে ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপ *** রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি, রাষ্ট্র সংলাপের আয়াসসহ ৪ জন ডিবি হেফাজতে *** নরেন্দ্র মোদিকে রাহুল গান্ধীর হুঁশিয়ারি, ‘মি. মোদি, আপনার যা খুশি করুন... সবাইকে গ্রেপ্তার করুন’ *** প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে *** দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুরের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি *** সবাই পুরুষ জেনেও উড়োজাহাজে সিজেপি নেতাদের ধরতে নারী পুলিশ কেন

‘ছেলের ঘরে একটু আশ্রয় চাই’, অসুস্থ মায়ের আকুতির জবাবে ছেলের আত্মহত্যার হুমকি

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ০৫:১৭ অপরাহ্ন, ৯ই অক্টোবর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার ব্যস্ত জীবনে কত মানুষের কত রকম চাওয়া। কারও নতুন বাড়ি, কারও দামি গাড়ি, কারও আরও একটু সচ্ছলতা। অথচ পাবনার সাঁথিয়ার মুন্নি খাতুনের (৫০) চাওয়াটা বড়ই সামান্য। অসুস্থ শরীর নিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো ছেলের কাছে কাটাতে চান তিনি। ছেলের কাছে সম্পদ চান না, চান না আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য। অল্প খেয়ে, সাধারণভাবে বেঁচে থেকেও সন্তানের সান্নিধ্যে থাকতে পারলেই যেন তার জীবনের অনেক না-পাওয়া পূর্ণ হয়।

কিন্তু যে ছেলেকে ঘিরে তার শেষ বয়সের আশ্রয়ের স্বপ্ন, সেই ছেলে সাগর হোসেন (৩০) তাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি নন। মাকে সঙ্গে রাখার অনুরোধের জবাবে তার বক্তব্য, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব।’

একদিকে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত মায়ের অসহায়ত্ব, অন্যদিকে ছেলের এমন অনড় অবস্থান। মা-ছেলের এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় পর্যন্ত। ছেলের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ পাওয়ার আশায় মুন্নি খাতুন লিখিত অভিযোগ করেছেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। গতকাল বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ওই অভিযোগের শুনানি হয়।

মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ছেলেই ছিলেন তার প্রধান ভরসা। কিন্তু ছেলের বিয়ের পর থেকে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মায়ের ভরণপোষণ ও তার সঙ্গে থাকার বিষয়টি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কয়েকবার সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করেও স্থায়ী সমাধান করতে পারেননি। পরে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন মুন্নি।

সাঁথিয়ার সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা সাগর হোসেন নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ হিসেবে কাজ করেন। অভিযোগের শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ তাকে মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। অসুস্থ মায়ের বয়সের শেষ অধ্যায়ে নিরাপদ আশ্রয় ও পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে পারিবারিকভাবে সমাধানে পৌঁছানোর অনুরোধ জানান তিনি।

কিন্তু মাকে নিজের বাড়িতে রাখার বিষয়ে সম্মতি দেননি সাগর। ইউএনওর কাছে তিনি জানতে চান, মাকে সঙ্গে না রাখলে মাসে কত টাকা দিতে হবে। একই সঙ্গে মাকে সঙ্গে রাখতে বাধ্য করা হলে আত্মহত্যা করবেন বলেও মন্তব্য করেন। পরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে তাকে কয়েক দিন সময় দেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে সমাধানে পৌঁছাতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইউএনও।

মুন্নি খাতুনের বক্তব্যে উঠে এসেছে তার চাওয়ার সরলতা। তিনি জানান, স্বামীকে হারিয়েছেন, মেয়ে সংসারী হয়েছেন, আর নিজে নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। এমন অবস্থায় সন্তানের কাছেই একটু নিরাপত্তা খুঁজছেন তিনি। ছেলের কাছ থেকে টাকা-পয়সা আদায় করা তার মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং শেষ বয়সে ছেলের সান্নিধ্য পাওয়াই তার আকাঙ্ক্ষা।

নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম আজ শুক্রবার মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় মুন্নি খাতুন ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন। ইউএনও সেলিম আহমেদও জানিয়েছেন, অভিযোগের পর উভয় পক্ষকে ডেকে কথা বলা হয়েছে। সমস্যাটি সমাধানে ছেলেকে সময় দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রবীণ মানুষের নিরাপত্তা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সন্তানের কাছে মা-বাবার অধিকার পাওয়ার প্রশ্ন। বয়স বাড়লে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে, অসুস্থতা বাড়ে, অনেকের আয় বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওষুধ, খাবার, চিকিৎসা ও থাকার জায়গার পাশাপাশি প্রয়োজন হয় পরিচিত মানুষের সঙ্গ। সন্তান যদি সেই সময় মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে সন্তানকে বড় করে তোলা মা-বাবার সামনে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়।

দেশে মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার জন্য আইন রয়েছে। ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ অনুযায়ী, সক্ষম ও সামর্থ্যবান সন্তানকে মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। আইনে ভরণপোষণের মধ্যে খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ দেওয়ার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে তাদের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে মা-বাবার দায়িত্ব নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, মা-বাবাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করাও নিষিদ্ধ।

এই আইনের ৫ ধারায় বিধান লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মা বা বাবার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত এ আইনের অধীনে অপরাধ আমলে নিতে পারে না। অর্থাৎ, মা-বাবার ভরণপোষণ কেবল নৈতিক দায়িত্বের বিষয় নয়, এর সঙ্গে আইনি বাধ্যবাধকতাও জড়িত। সরকারি আইনভান্ডারে আইনটির পূর্ণ পাঠ রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবহেলার এমন ঘটনা আগেও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০২৩ সালের ২৪ জুন সমকালের এক প্রতিবেদনে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে ৮৫ বছর বয়সী হারিছা বেগমের দুর্দশার কথা প্রকাশিত হয়। বয়সের ভারে চলাফেরা করতে না পারা ওই নারীকে ওয়াপদা মোড়ের একটি যাত্রীছাউনিতে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল।

একই বছরের ২৮ আগস্ট সমকালে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী লেখায় সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে পাঁচ ছেলের বিরুদ্ধে কর্মক্ষমতা হারানো মা-বাবাকে কবরস্থানের পাশে ফেলে যাওয়ার ঘটনার উল্লেখ করা হয়। লেখাটিতে প্রবীণ মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রশ্নটি সামনে আনা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গাজীপুরে বৃদ্ধ ও অসুস্থ এক বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে নেওয়ার কথা বলে জঙ্গলে ফেলে যাওয়ার খবর আসে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

এসব ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের, ভিন্ন পরিস্থিতির। তবে প্রতিটি ঘটনায় প্রবীণ মা-বাবার নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও দেখাশোনার প্রশ্নটি সামনে এসেছে। সাঁথিয়ার মুন্নি খাতুনের ঘটনাও সেই বৃহত্তর সামাজিক উদ্বেগের অংশ।

এ ধরনের খবর প্রকাশ্যে এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত পারিবারিক দায়িত্ব, সন্তানের কর্তব্য এবং প্রবীণদের প্রতি আচরণ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে মুন্নি খাতুনের ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নির্দিষ্ট মন্তব্যের নির্ভরযোগ্য নমুনা যাচাই করা যায়নি। তাই কারও নামে প্রতিক্রিয়া আরোপ না করে বলা যায়, ঘটনাটি সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখেছে—জীবনের সবচেয়ে অসহায় সময়ে মা-বাবা যদি নিজের সন্তানের কাছেই আশ্রয় না পান, তবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে?

মুন্নি খাতুনের চাওয়া খুব বড় কিছু নয়। তিনি চান, অসুস্থ শরীর নিয়ে শেষ বয়সে ছেলের ঘরে থাকতে। তার আকুতিতে সম্পদের দাবি নেই, আছে শুধু আপনজনের কাছে থাকার ইচ্ছা। আর এই সামান্য আশ্রয়ের জন্যই তাকে প্রশাসনের দরজায় যেতে হয়েছে।

আইন তার ভরণপোষণের অধিকার স্বীকার করে, স্থানীয় প্রশাসন সমাধানের চেষ্টা করছে। এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মা-ছেলের বিরোধের কোনো স্থায়ী সমাধান হয় কি না। কারণ মাসে কত টাকা দেওয়া হবে, সেই হিসাবের বাইরে একজন অসুস্থ মায়ের জীবনে আরও একটি প্রয়োজন রয়েছে—সন্তানের সান্নিধ্য, নিরাপত্তা এবং অবহেলিত না হওয়ার নিশ্চয়তা।

মা-বাবার ভরণপোষণ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250