ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেয়ালচিত্রে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা দুর্গাপূজার আগে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুর্গাপূজার প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনার মধ্যে এবার আক্রান্ত হলো বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম প্রতীক রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে এ ঘটনা ঘটে। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ঘটনার ভিডিও।
পুলিশ বলছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার সঙ্গে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক উসকানির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রশ্ন উঠেছে, ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো একটি দেয়াল কেন কয়েক দিনের মধ্যেই এমন ঘটনার লক্ষ্যবস্তু হলো? এটি কি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থানের প্রতিবাদ, নাকি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আঘাত করে সামাজিক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা? ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য তদন্তে বেরিয়ে আসার কথা। তবে যে উদ্দেশ্যেই এ কাজ করা হোক, একজন কবির প্রতিকৃতি বিকৃত করার ঘটনাকে নিছক দেয়ালে রং লাগানোর বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। কোন ধারায় বা কী অভিযোগে মামলা করা হবে, তা পরে জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে আয়াসকে আটকের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাকে প্রথমে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয় এবং পরে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনলাইন প্রতিক্রিয়ায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও কিংবা বিচ্ছিন্ন মন্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার পেছনে কোনো সংগঠিত গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং অন্য কেউ পরিকল্পনা বা উসকানিতে যুক্ত ছিলেন কি না, সেসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি নন; বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তার অবস্থান গভীর। তার সাহিত্যকর্মের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করা মানবতাবাদী চিন্তা ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তার প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও সাংস্কৃতিক প্রতীক বিকৃত করা গ্রহণযোগ্য প্রতিবাদের পদ্ধতি হতে পারে না।
এ ঘটনার পাঁচ দিন আগে, ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর পাশের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়সহ ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকে। পথচারীদের জন্য ফুটপাতটি উন্মুক্ত করার পাশাপাশি সেখানে বসার বেঞ্চ ও ময়লার ঝুড়ি স্থাপন এবং দেয়াল মেরামতের কাজও করা হয়। অর্থাৎ, জনপরিসরকে পরিচ্ছন্ন ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করার উদ্যোগের কয়েক দিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি বিকৃত করার ঘটনা ঘটল।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিমা ভাঙচুরের খবর আসছে। ৯ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার খয়েরচারা মাতৃমন্দিরে নির্মাণাধীন দুর্গাপূজার প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সেখানে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের কোনো কারণ পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের বক্তব্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বাংলা সংস্করণও ওই ঘটনায় দুর্গা ও লক্ষ্মী প্রতিমাসহ তিনটি প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশ করে। অন্যদিকে, ২৬ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবীদুবা ইউনিয়নের গালান্ধি চৌরঙ্গী শ্রীশ্রী দুর্গামন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের খবর প্রকাশ করেছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর।
এসব ঘটনার মধ্যে একটি মিল রয়েছে—ধর্মীয় উৎসবের প্রস্তুতির সময় প্রতিমা বা উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে হামলা কিংবা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠছে।
অতীতেও দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিবিসি বাংলার ১ অক্টোবর ২০১৯-এর এক প্রতিবেদনে পূজা উদ্যাপন পরিষদের বরাতে বলা হয়েছিল, দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সময় ১১টি জেলার ১৩টি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছিল। তখন কয়েকটি এলাকায় প্রতিমা পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। প্রথম আলোতেও বিভিন্ন সময়ে দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুর ও পূজামণ্ডপে হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব পুরোনো ঘটনা দেখায়, উৎসবের আগে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়; একই সঙ্গে অপরাধীদের শনাক্ত করা ও বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও দীর্ঘদিনের।
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনার সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ধর্মীয় উৎসবের আগে এমন ঘটনা মানুষের মধ্যে সন্দেহ, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়াতে পারে। কেউ যদি সাংস্কৃতিক প্রতীককে আঘাত করে বৃহত্তর সামাজিক বিভাজন তৈরির চেষ্টা করে থাকেন, তবে তা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দীন আহমদ ৬ অক্টোবর এবারের দুর্গাপূজাকে পুলিশের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। পূজামণ্ডপে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকের পুলিশ মোতায়েন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘোষণার মাত্র চার দিনের মাথায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি বিকৃত করার ঘটনা নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি প্রকাশ করা, ঘটনার ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা এবং জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগগুলোর তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরা দরকার। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর হামলা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো ঘটনা যাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর হাতিয়ার হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য অপরাধের বিচার যেমন জরুরি, তেমনি গুজব ও অপ্রমাণিত অভিযোগ ছড়ানো ঠেকানোও প্রয়োজন।
রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি মুছে ফেলা সম্ভব; কিন্তু এমন ঘটনার মাধ্যমে সমাজে যে অবিশ্বাস ও উদ্বেগ তৈরি হয়, তা দূর করা কঠিন। তাই প্রশ্নটি শুধু একটি দেয়ালচিত্রের নয়। প্রশ্নটি হলো—ধর্মীয় উৎসবের আগে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ এবং সাংস্কৃতিক প্রতীকে আঘাতের মতো ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে, আর অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে কতটা দৃঢ়তা দেখাচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন