ছবি: সংগৃহীত
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদের উড়োজাহাজের ভেতর থেকে আটক করার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পুলিশের একটি সিদ্ধান্ত—তিনজন পুরুষ নেতাকে ধরতে কেন নারী পুলিশ সদস্যদের পাঠানো হলো? আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ঘটনা ঘটে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছেছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সহসমন্বয়ক সৌরভ দাস ও মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা।
বিমান অবতরণের পর যাত্রীরা নেমে যাওয়ার আগেই পুলিশের একটি দল ভেতরে প্রবেশ করে তিন নেতাকে আটক করে। তাদের ঘিরে থাকা নারী পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অভিজিৎ দীপকের কথাকাটাকাটি হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিমান থেকে নামার পরও তো তাকে আটক করা যেত। এ সময় তিনি পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে আসতে বলেন এবং গ্রেপ্তার হতে ভয় পান না বলেও জানান।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রকাশিত ভিডিও ও প্রতিবেদনেও আটক করার এ দৃশ্য উঠে এসেছে। তবে নারী পুলিশ পাঠানোর পেছনে দিল্লি পুলিশের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ইন্ডিয়া টুডে সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছে। ফলে নারী পুলিশ মোতায়েনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে ব্যাখ্যাগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোকে পুলিশের নিশ্চিতভাবে ঘোষিত কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নারী পুলিশ পাঠানোর সম্ভাব্য কারণ বুঝতে হলে প্রথমে আটক করার স্থানটির বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করতে হয়। উড়োজাহাজের ভেতরে আসনের সারির মাঝখানের চলাচলের পথ সরু। একসঙ্গে অনেক পুলিশ সদস্য ঢুকলে কিংবা আটক করার সময় ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সেখানে যাত্রীদের উপস্থিতি, আসন ও অন্যান্য সরঞ্জামের কারণে পুলিশের চলাচলও সীমিত থাকে। এমন পরিস্থিতিতে তুলনামূলক কম উত্তেজনা সৃষ্টি করে অভিযান শেষ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরুষ পুলিশ সদস্যদের দিয়ে অভিযান চালালে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে—এমন বিবেচনা থেকে নারী সদস্যদের পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি সংবাদমাধ্যমটির সম্ভাব্য কারণের ব্যাখ্যা, দিল্লি পুলিশের নিশ্চিত করা তথ্য নয়। আটক করার সময় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটেনি বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঘটনাটিকে কেবল উড়োজাহাজের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখলে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি আড়ালে থেকে যায়। সিজেপির কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লি পুলিশের প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। তারপরও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সংগঠনটি। ফলে বিক্ষোভ শুরুর আগেই সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের আটক করা এবং তাদের যন্তর মন্তরে পৌঁছানো ঠেকানো প্রশাসনের অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিক্ষোভ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনকে সতর্ক করেছিল। দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি প্রত্যাখ্যান করার পরও আয়োজকেরা সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারেন—এমন আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল। রাজ্যগুলোর পুলিশের সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের চলাচলের ওপর নজরদারির নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে বিমানের ভেতর থেকেই তিন নেতাকে আটক করার সিদ্ধান্তের একটি তাৎপর্য হলো, তাদের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর সুযোগ না দেওয়া। নারী পুলিশ সদস্যদের পাঠানোর সিদ্ধান্তও সেই বৃহত্তর অভিযানের অংশ হয়ে থাকতে পারে। তবে নারী সদস্যদের ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক সমালোচনা এড়াতে চেয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
নারী পুলিশ মোতায়েনের আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে আগের আন্দোলন ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে। সিজেপির অভিযোগ, ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভে পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও তরুণীদের ওপর বলপ্রয়োগ করেছিল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ওই ঘটনাকে আন্দোলনের বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি পুলিশের আচরণ নিয়ে সমালোচনা করেন। এই পটভূমিতে পুরুষ পুলিশ সদস্যদের দিয়ে আবারও অভিযান চালালে আগের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসতে পারত। নারী পুলিশ সদস্যদের সামনে রাখলে এমন পরিস্থিতির ঝুঁকি কমবে—এমন হিসাব প্রশাসনের মধ্যে কাজ করে থাকতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের অভিযানের দৃশ্য এখন আর ঘটনাস্থলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অভিজিৎ দীপকে নিজেই মুঠোফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আটক করার ধরন, পুলিশ সদস্যদের আচরণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য—সবই রাজনৈতিক বিতর্কের উপাদান হয়ে ওঠে। নারী পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে অভিযান চালানো হলে বলপ্রয়োগের দৃশ্য তুলনামূলক কম উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে, এমন ধারণা প্রশাসনের কৌশলগত বিবেচনায় থাকতে পারে। কিন্তু শুধু নারী পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলেই অভিযানটি নিরপেক্ষ বা মানবিক ছিল, এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না। অভিযানের বৈধতা, আটক করার প্রয়োজনীয়তা এবং পুলিশের আচরণ—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।
দিল্লিতে ওই দিন শুধু বিমানবন্দরের অভিযানই নয়, বিক্ষোভ ঠেকাতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে শত শত মানুষকে আটক করা হয় এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা ও মুঠোফোনের ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো বিরোধী নেতাদের আটক করার ঘটনাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।
এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, প্রশাসনের পদক্ষেপ কেবল তিন নেতাকে আটক করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিক্ষোভের সংগঠক ও সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের রাজধানীতে জমায়েত হতে না দেওয়াই ছিল সামগ্রিক ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। এই অবস্থায় উড়োজাহাজের ভেতরে নারী পুলিশ পাঠানোর সিদ্ধান্তকে বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনে সংঘর্ষ এড়ানো, আগের পুলিশি আচরণ নিয়ে সমালোচনা কমানো কিংবা জনমতের ওপর প্রভাব ফেলার মতো একাধিক বিবেচনা কাজ করেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বক্তব্য প্রয়োজন।
ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। সিজেপি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ দাবি করছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনকে নিয়মিত যাচাইপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে। ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ, আন্দোলনের অনুমতি প্রত্যাখ্যান এবং বিরোধীদের আটক—সব মিলিয়ে নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ এবং সরকারের অবস্থানের কথা এসেছে।
অতএব, সবাই পুরুষ জেনেও উড়োজাহাজে সিজেপি নেতাদের আটক করতে নারী পুলিশ পাঠানোর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা হলো, সীমিত জায়গায় উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা। পাশাপাশি আগের আন্দোলনে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে জনমনে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, সেসব বিষয়ও সম্ভাব্য বিবেচনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
নারী পুলিশ মোতায়েনের পেছনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল—এমন দাবি নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ নেই। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দিল্লির ওই অভিযান ছিল বিক্ষোভ শুরুর আগেই আন্দোলনকারীদের থামিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। নারী পুলিশ পাঠানো হয়েছিল কেন, তার চূড়ান্ত উত্তর মিলবে কেবল পুলিশের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশিত হলে।
খবরটি শেয়ার করুন