ছবি: সংগৃহীত
ফরিদপুর শহরের অলিগলি দিয়ে হাঁটলে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে এক অদ্ভুত নারীর। কাঁধে পুরোনো থলে, শরীরে বিবর্ণ কাপড়, এলোমেলো চুলে বাতাস খেলে যায়। কখনো রিকশাস্ট্যান্ডের পাশে বসে আপনমনে গুনগুন করছেন, কখনো মাজারের আঙিনায় চোখ বুজে গেয়ে উঠছেন কোনো আধ্যাত্মিক গান। শহরের মানুষ তাকে চেনে ‘লাইলী খালা’ নামে। কেউ বলেন পাগলি, কেউ বলেন ভবঘুরে, আবার অনেকের কাছে তিনি নিছকই এক মাটির শিল্পী। সেই লাইলী বেগমই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচিত নাম।
মাত্র একটি গান বদলে দিয়েছে তার পরিচয়ের পরিধি। নজরুলজয়ন্তীর এক অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল’ গেয়েছিলেন তিনি। মঞ্চে কোনো আড়ম্বর ছিল না, ছিল না আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের চাকচিক্যও। কিন্তু তার কণ্ঠে জমে থাকা জীবনের দীর্ঘশ্বাস, অভিমান আর আত্মার আর্তি গানটিকে এমন এক গভীরতায় পৌঁছে দেয়, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে মানুষের হৃদয়ে। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ বিস্ময়ে আবিষ্কার করেন—ফরিদপুরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এই নারী আসলে এক অনন্য প্রতিভা।
লাইলী বেগমের বয়স এখন প্রায় পঁয়ষট্টি। কিন্তু তাকে দেখলে বয়স বোঝা কঠিন। জীবনের কষ্ট যেন তার শরীরকে দ্রুত বুড়িয়ে দিয়েছে। ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন মা-বাবাকে। এমনকি নিজের জন্মদাতা বাবা-মায়ের মুখও স্পষ্ট মনে নেই তার। পরে শহরের গোয়ালচামট এলাকার এক নারী তাকে আশ্রয় দেন। সেই পালিত মায়ের হাত ধরেই শুরু হয় গানের সঙ্গে তার সম্পর্ক। হারমোনিয়ামের সুরে সুরে বড় হতে থাকেন তিনি। মেলায়, ওরসে, আধ্যাত্মিক গানের আসরে ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানেই গান হয়ে ওঠে তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
জীবনের এক পর্যায়ে বিয়ে হয় হারুকান্দি এলাকার শেখ ইসলামের সঙ্গে। সংসার, সন্তান—সবই ছিল। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মা হন তিনি। কিন্তু গানকে কেন্দ্র করেই দাম্পত্য জীবনে তৈরি হয় টানাপোড়েন। স্বামীর আপত্তি ছিল তার গান গাওয়া নিয়ে। পরে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে ভেঙে পড়ে লাইলী বেগমের ভেতরের পৃথিবী। অভিমান জমে ওঠে বুকের গভীরে। একদিন নিঃশব্দে ছেড়ে বেরিয়ে আসেন সংসার। তারপর থেকে পথই তার ঠিকানা।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ ১৩ থেকে ১৫ বছর আগেই ছেড়েছেন স্বামীর বাড়ি, হয়েছেন সংসারবিরাগী। এরপর থেকে কখনো স্থায়ীভাবে বাড়িতে থাকেননি। দিনরাত থাকেন পথে প্রান্তরে, কখনো থাকেন মাজারে আবার কখনো ছুটে যান পল্লি কবি জসিমউদ্দিনের বাড়িতে। এ ছাড়া কোনো গানের আসর বা মঞ্চ দেখলেই ছুটে যান সেখানে এবং চেষ্টা করেন গান গাইতে।
এখন তিনি কোথায় রাত কাটাবেন, সেটি আগে থেকে কেউ জানে না। কখনো কোনো মাজারে, কখনো কোনো গানের আসরে, আবার কখনো পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের বাড়ির আশপাশে তাকে দেখা যায়। নিজের একটি ছোট্ট ঘর থাকলেও সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন না। যেন ঘর তাকে ধরে রাখতে পারে না। শহরের বাতাস, মানুষের মুখ, মেলার ভিড় আর গানের আসরই তার প্রকৃত আশ্রয়।
মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না তিনি। ফলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করাও সহজ নয়। অনেক সময় দিনের পর দিন কেউ তার খোঁজ পায় না। হঠাৎ আবার কোনো অনুষ্ঠানে দেখা মেলে। অনুষ্ঠান থাকুক বা না থাকুক, তিনি চলে যান গানের টানে। যদি কোথাও একটি গান গাওয়ার সুযোগ মেলে!
ফরিদপুরের প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলতাফ হোসেন বলেন, “দুই দশকের বেশি সময় ধরে আমি লাইলী বেগমকে দেখছি। তিনি কখনো কারও ক্ষতি করেননি। নিজের মতো করে গান নিয়ে বেঁচে আছেন। তার চোখে একটা অন্যরকম মায়া আছে।”
শহরের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত অনেকেই বলেন, লাইলী বেগম আসলে আমাদের সমাজের অবহেলিত শিল্পীদের প্রতীক। যাদের অসাধারণ প্রতিভা থাকে, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা থাকে না। তাই তারা হারিয়ে যান লোকচক্ষুর আড়ালে।
লাইলী বেগম নিজেও আক্ষেপের সুরে বলেন, “আমাদের কদর কেউ করে না। কিন্তু আমি গান ছাড়তে পারব না। গানই আমার প্রাণ। গান গাইলেই মনে হয় আমি বেঁচে আছি।”
তার কথার ভেতরে কোনো অভিযোগের তীব্রতা নেই, বরং আছে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সমর্পণ। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের স্বীকৃতির চেয়ে সৃষ্টিকর্তার দয়া বড়।
ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তার গান শুনে আবেগাপ্লুত হয়েছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, “এমন কণ্ঠ কোটি টাকায়ও পাওয়া যায় না।”
ফেসবুক ব্যবহারকারী রাফিদ মাহমুদ লিখেছেন, “অটো-টিউনের যুগে এই কণ্ঠ শুনে শরীর কেঁপে উঠেছে। এই নারী গান গাইছেন না, নিজের জীবন খুলে দিচ্ছেন।”
নেটিজেন সুমাইয়া তাসনিম মন্তব্য করেন, “লাইলী বেগমকে দেখে মনে হলো বাংলার মাটি এখনো শিল্পী জন্ম দিতে জানে। কিন্তু আমরা তাদের মূল্য দিতে জানি না।”
আরেকজন, মাহির আবেদীন লিখেছেন, “যে সমাজে সত্যিকারের শিল্পী রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, সেই সমাজের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
অনেকে আবার তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সংস্কৃতিকর্মী পরিচয়ে ফেসবুকে লেখা এক পোস্টে নীলয় রহমান বলেন, “এই নারীকে শুধু ভাইরাল বানিয়ে থেমে গেলে চলবে না। তার চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক পরিচর্যার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”
তবে ভাইরাল হওয়ার পরও লাইলী বেগমের জীবনযাত্রায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। এখনো তাকে শহরের পথে পথে ঘুরতে দেখা যায়। এখনো তিনি কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন—হয়তো কেউ ডাকবে, হয়তো গান গাওয়ার সুযোগ হবে।
তার মানবিকতার গল্পও শহরের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর তাকে রিকশাভাড়া হিসেবে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মনে হওয়ায় তিনি সেই টাকা ফেরত দিয়ে বলেছিলেন, “যাদের বেশি দরকার, তাদের দেন।” এই একটি বাক্য যেন লাইলী বেগমের পুরো জীবনকে ব্যাখ্যা করে। অভাব তাকে কঠিন করেনি, বরং আরও কোমল করেছে।
বাংলার লোকঐতিহ্যে এমন অনেক শিল্পীর গল্প ছড়িয়ে আছে, যারা খ্যাতির আলো থেকে দূরে থেকেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। লাইলী বেগমও হয়তো তাদেরই একজন। তিনি হয়তো বড় কোনো মঞ্চের শিল্পী নন, নেই কোনো অ্যালবাম কিংবা টেলিভিশনের ঝলমলে পরিচিতি। তবু তার কণ্ঠে এমন এক সত্যতা আছে, যা মানুষকে থামিয়ে দেয়।
আজ যখন সামাজিক মাধ্যমের কৃত্রিম আলোয় অনেক কিছুই মুহূর্তে বিখ্যাত হয়ে ওঠে, সেখানে লাইলী বেগমের ভাইরাল হয়ে ওঠা যেন অন্যরকম এক ঘটনা। কারণ তিনি ভাইরাল হয়েছেন সাজানো চেহারা বা অভিনয় দিয়ে নয়; হয়েছেন জীবনের গভীরতম বেদনা আর নির্মল শিল্পবোধ দিয়ে।
ফরিদপুরের পথঘাটে ঘুরে বেড়ানো এই নারী হয়তো এখনো জানেন না, তার গান কত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। হয়তো আগামীকালও তিনি আগের মতোই কোনো মাজারের পাশে বসে গেয়ে উঠবেন। কিন্তু মানুষ তাকে এখন নতুনভাবে দেখছে—একজন ভবঘুরে নারী হিসেবে নয়, বরং এক অবহেলিত অথচ অসাধারণ শিল্পী হিসেবে।
লাইলী বেগমের জীবন আসলে একটি গান—যে গানের সুরে আছে বেদনা, স্বাধীনতা, অভিমান, ভালোবাসা আর অদম্য বেঁচে থাকার গল্প।
খবরটি শেয়ার করুন