ছবি: সংগৃহীত
কপ–২৯ জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আজারবাইজান সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সফরে ৭৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল, বিদেশ সফরে ব্যয়ের ধরন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আল জাজিরায় কর্মরত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। তার একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে গতকাল সোমবার থেকে অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের জানান, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলা হলেও বাস্তবে বিদেশ সফরে ব্যয়ের ক্ষেত্রে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। তিনি লেখেন, “কপ-২৯ সম্মেলনে ৭৯ জনের টিম নিয়ে আজারবাইজান গিয়েছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সম্পূর্ণ তালিকাটি আপনাদের সুবিধার্থে প্রকাশ করা হলো।”
পোস্টের সঙ্গে তিনি সফরসঙ্গীদের একটি দীর্ঘ তালিকাও প্রকাশ করেন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী, উপদেষ্টা পর্যায়ের সদস্য এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিদের নাম রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
জুলকারনাইন সায়ের তার পোস্টে আরও লেখেন, “ইউনূস সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় অর্থের কৃচ্ছ্রসাধনের বহু গল্প শোনালেও নিজ সফরের সময় রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার তিনি করেছেন।”
তিনি যুক্তরাজ্য সফরের একটি উদাহরণ টেনে আনেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ রাজার কাছ থেকে ব্যক্তিগত পুরস্কার গ্রহণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে সফরের সময় ইউনূস ও তার দলের ৩৯ সদস্যের জন্য লন্ডনের বিলাসবহুল দ্য ডরচেস্টার হোটেলে চার রাতের জন্য ৩৭টি কক্ষ বুক করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, ওই সফরে হোটেল বিল বাবদ ব্যয় হয়েছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৩২৫ ব্রিটিশ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার সমান।
সায়েরের পোস্ট অনুযায়ী, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা যে কক্ষে অবস্থান করেছিলেন, সেই কক্ষের দৈনিক ভাড়া ছিল ৬ হাজার ৪৫ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ টাকা। চার দিনের জন্য শুধু ওই কক্ষের বিলই আসে প্রায় ৪০ লাখ টাকা। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ভাড়ার কক্ষটির দৈনিক ব্যয়ও ছিল ৮২৫ পাউন্ড বা প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
সবশেষে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আচ্ছা, আজারবাইজানের কপ-২৯ সম্মেলনে ৭৯ জন সদস্যের খরচ কেমন হতে পারে? দেখি একটু খোঁজ নিয়ে।” ফেসবুকে পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বড় প্রতিনিধিদল নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ঢাকার বাসিন্দা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মাহির রহমান মন্তব্য করেন, “যে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলে, তাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও সেই নীতি মানা উচিত। জনগণের টাকায় বিদেশ সফর হলে জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাদিয়া নওরীন লেখেন, “কপ সম্মেলন শুধু রাজনৈতিক সফর নয়, সেখানে পরিবেশ, অর্থনীতি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—অনেক বিষয় জড়িত থাকে। বড় প্রতিনিধিদল থাকা মানেই অপচয়—এমনটা সরলীকরণ করা ঠিক নয়।”
আরেক নেটিজেন রাশেদ করিম প্রশ্ন তোলেন ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে। তার ভাষায়, “দেশে অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি আর বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় বিদেশ সফরে বিলাসী ব্যয়ের অভিযোগ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করবেই।”
তবে কেউ কেউ এই সমালোচনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তানভীর হাসান নামের একজন লেখেন, “শুধু সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে হবে না। ওই সফরের অর্জন কী ছিল, আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটাও দেখতে হবে।”
অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিদেশ সফরে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ব্যাখ্যা দেওয়ার সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ।
আরিফুল কবির বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বড় প্রতিনিধিদল যেতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু সম্মেলনের মতো ইভেন্টে পরিবেশ, অর্থনীতি, জ্বালানি, কূটনীতি—বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা থাকেন। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোন খাতে কত খরচ হলো, কেন হলো এবং তার ফলাফল কী—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকারি সফর নিয়ে মানুষের সংবেদনশীলতা বেশি। কারণ মানুষ দেখতে চায়, তাদের করের টাকা কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার হচ্ছে।”
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও প্রশাসন বিশ্লেষক মাহবুবুল আলম মনে করেন, বিদেশ সফরে ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় ‘ভিভিআইপি সংস্কৃতি’ ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। তার মতে, “রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানদের নিরাপত্তা ও প্রটোকলের কারণে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় অনিবার্য। কিন্তু বিলাসিতা আর প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকতে হবে।”
কপ–২৯ সম্মেলন বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, পরিবেশবিদ, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এ ধরনের সম্মেলনে সক্রিয় উপস্থিতিকে সরকার সব সময় গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
তবে এবার বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে প্রতিনিধিদলের আকার ও সম্ভাব্য ব্যয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ৭৯ সদস্যের দল আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না। আবার কেউ কেউ বলছেন, কেবল সংখ্যা নয়, সফরের প্রকৃত ব্যয় ও অর্জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ পেলেই বিতর্কের অবসান হতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আজারবাইজান সফরের মোট ব্যয়, প্রতিনিধিদলের খাতভিত্তিক ব্যয় কিংবা হোটেল ও পরিবহন সংক্রান্ত তথ্যও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক যত বাড়ছে, ততই জোরালো হচ্ছে একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনের বার্তা দেওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের ক্ষেত্রে কতটা সেই নীতি অনুসরণ করছেন।
খবরটি শেয়ার করুন