ছবি: সংগৃহীত
কয়েক দিন আগেও যে মেয়েটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণবন্ত হাসি, গল্প আর জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট দিয়ে হাজারো তরুণের দিন রাঙিয়েছেন, আজ তাকেই ঘিরে শোকের দীর্ঘ ছায়া। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের চলে যাওয়ার খবর শুধু তার পরিবারকেই নয়, স্তব্ধ করে দিয়েছে তার দর্শক, সহকর্মী ও অনুরাগীদেরও। আর এই শোকের সবচেয়ে ভারী অংশ যেন এসে থেমেছে তার মা লোপা কায়সারের কাঁধে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতের চেন্নাই নেওয়া হয়েছিল কারিনা কায়সারকে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা ছিল—অসুস্থতার এই কঠিন লড়াইয়ে জয়ী হয়ে তিনি ফিরবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হলো না। চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার মরদেহ নিয়ে আজ রোববার ঢাকায় ফিরছেন তার মা লোপা কায়সার।
মেয়ের মৃত্যুর শোক যেন শব্দের ভেতরেও ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে লোপা কায়সারের জন্য। সোমবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চেন্নাইয়ে কারিনার পাশে ছিলেন তিনি এবং তার ছোট দুই ভাই। হাসপাতালের করিডোর, চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনার দীর্ঘ সময়, অনিশ্চয়তার অপেক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে গত কয়েকটি দিন তাদের পরিবারের জন্য ছিল দুঃসহ এক অভিজ্ঞতা।
আজ দুপুরে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন লোপা কায়সার। সেখানে তিনি লেখেন, “জীবনের অনেক বড় বড় পরীক্ষা হাসিমুখে পার করেছি। কখনো কারও কাছে কিছু চাইনি, কারও অপকার করিনি। সব সময় চেষ্টা করেছি মানুষের উপকার করতে। আজ আমার মেয়েকে ছাড়া জীবনের ভার আমি কীভাবে বয়ে বেড়াব, জানি না।”
মায়ের এই কয়েকটি বাক্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকে মন্তব্যে শুধু সমবেদনা জানাননি, নিজেদের ব্যক্তিগত শোকও প্রকাশ করেছেন। অনেকেই লিখেছেন, একজন মায়ের কাছে সন্তানের চলে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর শূন্যতা।
কারিনার মৃত্যুর খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ স্মৃতিচারণা করছেন। কেউ তার ভিডিও শেয়ার করছেন, কেউ তার সংলাপ, কেউবা তার হাসিমাখা ছবিগুলো পোস্ট করছেন।
ফেসবুকে নেটিজেন মাহির আরাফাত লিখেছেন, “কয়েক দিন আগেও তার একটি ভিডিও দেখেছিলাম। মানুষটা এত প্রাণবন্ত ছিল! বিশ্বাসই হচ্ছে না তিনি আর নেই। কিছু মৃত্যু খুব দ্রুত মেনে নেওয়া যায় না।” তানজিলা রহমান নামের আরেকজন লেখেন, “একজন মায়ের এই কথাগুলো পড়ার পর চোখের পানি ধরে রাখা যায়নি। সন্তান হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”
নাসির উদ্দিন নামের আরেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “জীবনে কত কিছু নিয়ে আমরা অভিযোগ করি। কিন্তু এমন একটা সংবাদ মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য আসলে কত নির্মম।”
অনেকে আবার কারিনার সৃষ্টিশীল কাজের কথাও তুলে ধরছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ থেকে অভিনয়ের জগতে তার ধীরে ধীরে উঠে আসার পথটিকে অনেকেই অনুপ্রেরণার গল্প বলছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ বাদ মাগরিব রাজধানীর বনানীর ডিওএইচএস মাঠে কারিনার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বাদ এশা বনানী দরবার শরিফে দ্বিতীয় জানাজা হবে। একই দিন রাত ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে তার মরদেহ। পরদিন সোমবার বাদ ফজর মুন্সিগঞ্জের আবদুল্লাহপুরে তাকে দাফন করা হবে।
স্বজনদের ভাষায়, শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে চান অনেকেই। জীবদ্দশায় যাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, যারা তার ভিডিওর দর্শক ছিলেন, যারা হয়তো কখনো তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেননি—তাদের কাছেও এই বিদায় যেন খুব ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, লিভার-সংক্রান্ত জটিলতায় কয়েক দিন ধরে সংকটাপন্ন ছিলেন কারিনা। প্রথমে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতের চেন্নাই নেওয়া হয়। সেখানে ভেলোরের খ্রিষ্টান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল।
চিকিৎসকেরা প্রথমে তার ফুসফুসের চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। পরে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রস্তুতিও চলছিল। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হন কারিনা। পরে তার শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। একই সঙ্গে হেপাটাইটিস এ এবং ই-জনিত জটিলতায় তার লিভার ফেইলিউর দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং পরে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিতি পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে অভিনয় ও চিত্রনাট্য লেখার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন কারিনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট তাকে তরুণ দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। পরে ওটিটি ও নাটকের জগতেও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ইন্টার্নশিপ’ ও ‘৩৬-২৪-৩৬’।
মানুষের জীবন কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে অসমাপ্ত থেকে যায়। অনেক পরিকল্পনা, অনেক স্বপ্ন, অনেক অপ্রকাশিত গল্পও হয়তো সঙ্গে নিয়ে চলে যেতে হয়। কারিনা কায়সারের জীবনও হয়তো তেমনই একটি অসমাপ্ত গল্প হয়ে রইল। তবে তার চলে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো স্মৃতি, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা আর এক মায়ের অসহায় প্রশ্ন—“মেয়েকে ছাড়া জীবনের ভার আমি কীভাবে বয়ে বেড়াব”—সেই গল্পকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।
খবরটি শেয়ার করুন