ছবি: সংগৃহীত
বিমানে টিকিট নিয়ে নৈরাজ্য নতুন নয়। যখনই যাত্রীদের চাপ বাড়ে, তখন বিমান কোম্পানিগুলো টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেয়। অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রুটে বিমানে ভ্রমণের টিকিট নিয়ে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মনে হচ্ছে, এসব দেখার কেউ নেই।
বিভিন্ন রুটে বিমান সংস্থাগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে কয়েকগুণ ভাড়া আদায় করছে। এর ফলে জরুরি কাজে বিদেশগামী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যগামী এয়ারলাইন্সগুলোর টিকিটের দাম সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ছে। গত তিন মাসে ভাড়া বেড়েছে ৩০-৪০ হাজার টাকা।
যার কারণে ওমরাহ হজসহ সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী শ্রমিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সিন্ডিকেট ও এজেন্সিগুলোর কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ যাত্রীরা অসহায় হয়ে পড়ছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হলেও তারা টিকিট কিনতে ধরাশায়ী হচ্ছেন। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো রুটের টিকিটের দাম শেষ তিন মাসে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়েছে।
ঢাকা থেকে সৌদি আরব রুটে আগে যেখানে টিকিটের দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, সেখানে এখন এ রুটে ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ওমরা হজের যাত্রীরা এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। একইভাবে বিদেশে চিকিৎসাপ্রার্থীরাও দুর্ভোগে পড়ছেন।
বিমানের টিকিটের চাহিদার বিপরীতে আসনসংখ্যা বেশিরভাগ রুটেই কম। ফলে যখন চাহিদা একটু বেড়ে যায়, তখন এয়ারলাইনসগুলো টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেয়। শুধু এয়ারলাইনসগুলো দাম বাড়ালেও হয়তো গ্রাহকের ওপর অতটা চাপ পড়ত না।
এয়ারলাইনসগুলো যখন একটু দাম বাড়ায়, তখন আবার কয়েকটি বড় ট্রাভেল এজেন্সিও টিকিটগুলো কিনে স্টক করে। পরে সেগুলো তারা অনেক বেশি দামে বিক্রি করে। ফলে টিকিট কিনতে তখন গ্রাহককে তিন-চার গুণ বেশি টাকা গুনতে হয়।
এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ করে টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে কারসাজি রয়েছে। এর জন্য উচ্চ ভ্রমণ কর, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ, ল্যান্ডিং ও পার্কিং চার্জ বাড়ানো এবং ডলার সংকটের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক পরিপত্রকে দায়ী করছেন তারা।
এ পরিপত্রে বলা হয়েছে, এখন থেকে কোনো বিমান সংস্থা তিনদিন বা ৭২ ঘণ্টার বেশি কোনো টিকিটের বুকিং রাখতে পারবে না। টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে এ নির্দেশনা জারি করা হলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। পরিপত্র জারির ফলে আকাশপথে ভাড়া নিয়ে আরো অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ডলার সংকটের কারণে টিকিট বিক্রির ২ হাজার কোটি টাকার বেশি দেশের ব্যাংকগুলোতে আটকে আছে। বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো এ অর্থের ‘কস্ট্ অব ফান্ড’ সমন্বয়ের জন্য টিকিটের দাম বাড়িয়েছে।
ওই পরিপত্রের পর দেশের ট্রাভেল এজেন্টরা এখন গ্রুপ টিকিটের জন্য বিদেশি ট্রাভেল এজেন্সির দ্বারস্থ হচ্ছেন। এতে পুরো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অব্যাহত থাকলে আকাশপথের ৪০ হাজার কোটি টাকার টিকিট ব্যবসার পুরোটাই বিদেশে পাচারের আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, সরকারের ওই সিদ্ধান্তের ফলে যাত্রীরাই কেবল দুর্ভোগে পড়েননি, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিমান যাত্রীরা ভাড়া নৈরাজ্যের কারণে বিদেশ যেতে পারবেন না বা টিকিট সংগ্রহে দুর্ভোগের শিকার হবেন, এটা মেনে নেওয়া যায় না। বস্তুত টিকিটের দাম নির্ধারণ ও বুকিং পদ্ধতিতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা দরকার। এক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করাও জরুরি।
এইচ.এস/