ছবি: সংগৃহীত
দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার আলোচনা চলে আসছে। সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তিনি যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক অবস্থান নিয়েই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার সংকট, গবেষণার দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ববি হাজ্জাজের একটি মন্তব্য থেকে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যে ধরনের কাজ করছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ‘কানাকড়িও করে না’।
এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া আসে আজ শুক্রবার (২৯মে) অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুনের কাছ থেকে।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, যদি ববি হাজ্জাজ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ বলেই থেমে যেতেন, তাহলে তিনি এতটা বিস্মিত হতেন না। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যে দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী, সে বিষয়ে তিনি নিজেও বহুবার প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। কিন্তু নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে বলে যে দাবি করা হয়েছে, সেটিকেই তিনি ‘ভীষণ আপত্তিকর’ বলে উল্লেখ করেন।
তার মতে, একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে আরও দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান প্রত্যাশিত। তিনি অভিযোগ করেন, ববি হাজ্জাজ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার কারণে হয়তো সেই প্রতিষ্ঠানকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। এর ফলে দেশের উচ্চশিক্ষাকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা সংশ্লিষ্টতার প্রভাব তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
ড. মামুনের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো—তিনি নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো পূর্ণাঙ্গ অর্থে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতেও রাজি নন। তার ভাষায়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নতির পথে থাকলেও এখনো প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়নি।
তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস নেওয়া বা ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, নতুন ধারণা উদ্ভাবন এবং উচ্চতর একাডেমিক চর্চার কেন্দ্র হওয়া উচিত।
এই অবস্থানের পক্ষে তিনি কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার মতে, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো মৌলিক বা ফান্ডামেন্টাল বিষয়গুলো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ইকোসিস্টেমও গড়ে ওঠেনি। শিক্ষকরা প্রায় সারা বছর ক্লাস নেওয়ার ব্যস্ততায় থাকেন, ফলে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ পান না।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী পিএইচডি প্রোগ্রাম কতটুকু রয়েছে? পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার সুযোগই বা কোথায়?
ড. মামুন আরও বলেন, শুধু গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বিচার করা যায় না। গবেষণা কোথায় প্রকাশিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সাময়িকী যেমন নেচার, নেচার কমিউনিকেশনস কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এপিএস-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ জার্নালে কতগুলো গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।
তার মতে, প্রতিটি বিষয়েরই কিছু ফ্ল্যাগশিপ জার্নাল থাকে এবং সেসব জায়গায় উপস্থিতিই গবেষণার প্রকৃত মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমালোচনা করলেও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজনের পক্ষে নন। বরং তিনি চান, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হোক। কারণ, একটি দেশের উন্নয়ন ও তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টি বোর্ড নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তার অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ট্রাস্টি বোর্ড সদস্যরা অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকার পরিবর্তে মালিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং প্রতিষ্ঠানকে শিল্পকারখানার মতো পরিচালনা করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত সম্পদ ও সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি হওয়াটা একটি সম্মানের বিষয় হওয়া উচিত, ব্যবসায়িক সুযোগ নয়।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও তিনি কোনো রাখঢাক করেননি। তিনি স্বীকার করেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ‘ডুবন্ত জাহাজ’-এর মতো অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এর দায় তিনি মূলত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর চাপিয়েছেন।
শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সরকার একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং অবনতির জন্য রাজনৈতিক নিয়োগকে দায়ী করে, অন্যদিকে নিজেরাই দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেয়। তার মতে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উপাচার্যের ভূমিকা এতটাই প্রভাবশালী যে নিয়োগ বোর্ড অনেক সময় কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করে। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের পথ উন্মুক্ত থাকে।
এই অবস্থাকে তিনি ‘দ্বিচারিতার চরম উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যা দেন। কারণ, যারা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলছেন, তারাই আবার সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছেন।
ড. মামুনের ভাষায়, প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হতে হলে এর সব নিয়মকানুন ও পরিচালনাগত কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ডের পরিবর্তে স্থানীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে তিনি হতাশার সঙ্গে মন্তব্য করেন যে, দেশে প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ই নেই।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সম্পর্কে তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্সের জন্মস্থান হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যারা বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালনা করেন। যদিও তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, এবং এই অবনতির জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো তাদের যাত্রার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
পোস্টের শেষদিকে তিনি একটি প্রশ্নও ছুড়ে দেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক তাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেছেন—এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে বোঝাতে চেয়েছেন যে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানবসম্পদ তৈরিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ড. মামুনের এই মন্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার বক্তব্যকে বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্জনকে যথাযথ মূল্যায়ন করেননি।
ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহবুব রহমান নামে একজন লেখেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা আছে, কিন্তু তাই বলে এর ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার করা যায় না। দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও গবেষণার বড় অংশ এখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে।”
নেটিজেন সায়মা ইসলাম মন্তব্য করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের মান শুধু ইতিহাস দিয়ে বিচার করা যায় না। বর্তমানে শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও মূল্যায়ন প্রয়োজন।”
রাকিবুল হক নামে আরেকজন লেখেন, “ড. মামুন যে গবেষণা, পিএইচডি এবং পোস্ট-ডকের বিষয়গুলো তুলেছেন, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়া দরকার।”
তবে তানভীর হাসান নামে এক নেটিজেনের মন্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, “নর্থ সাউথ বা ব্র্যাককে বিশ্ববিদ্যালয় মনে না করার বক্তব্য অনেক বেশি কঠোর। এসব প্রতিষ্ঠানও দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।”
সামাজিক মাধ্যমে চলমান বিতর্ক থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে অসন্তোষ শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক সংকট, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগত সীমাবদ্ধতা, ট্রাস্টি বোর্ডের ভূমিকা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা এবং শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার প্রশ্ন—সবকিছু মিলিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়নের দাবি জোরালো হচ্ছে।
ড. কামরুল হাসান মামুনের বক্তব্য তাই কেবল একটি প্রতিক্রিয়া নয়; এটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার শক্তি, দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন