তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও তার ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান। ছবি: বিবিসি
আচমকা বাংলাদেশে সফরে এসেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান। তার সঙ্গে রয়েছেন জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার মেসুত ওজিল এবং তুরস্কের সহযোগী সংস্থা টিকার চেয়ারম্যান ও 'বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব' আরন আবদুল্লাহ। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শপথ নেওয়ার ঠিক পরের দিনই এই সফর হওয়ায় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে উঠছে নানা প্রশ্ন। খবর দ্য স্টেটসম্যানের।
ভারতীয় গণমাধ্যম স্টেটসম্যানের কাছে সূত্রের দাবি, সফরটি আগে থেকে প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। গতকাল বুধবার (১৮ই ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকায় পৌঁছে তারা প্রথমে একটি হোটেলে যান, পরে টিকার স্থানীয় দপ্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মেডিকেল সেন্টারের উদ্বোধনে যোগ দেন। দেশীয় গণমাধ্যম তুরস্কের প্রেসিডেন্টের ছেলের 'রহস্যময়' বাংলাদেশ সফর নিয়ে তেমন প্রশ্ন না তুললেও দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছে সফরটি কিছুটা 'প্রশ্নবিদ্ধ'।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে ‘টার্কিশ কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন এজেন্সির’ (টিকা) আর্থিক সহায়তায় একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তুর্কি সরকারের সহযোগী সংস্থা টিকার প্রকল্পের অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মুর্তজা মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পে সহায়তা দিয়েছে তুর্কি সরকার। আওয়ামী লীগের সাবেক সরকারের আমলে প্রগতিশীল সমাজের সমালোচনা থাকায় টিকা বাংলাদেশের কোনো প্রকল্পে আর্থিক সহায়তার সুযোগ পায়নি।
মূলত টিকার একটি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্যই গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন বিলাল এরদোয়ান ও মেসুত ওজিল। ফলে এরদোয়ানের ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ানের সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছে স্টেটসম্যান ও আনন্দবাজার পত্রিকাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
স্টেটসম্যান জানায়, বিলাল এরদোয়ানের দ্বিতীয় দিনে আজ বৃহস্পতিবার তাদের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে। সেখানে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক, তুরস্ক-সমর্থিত ফিল্ড হাসপাতাল ও শিক্ষা-সংস্কৃতি কেন্দ্র ঘুরে দেখা এবং রোহিঙ্গা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানায় ভারতীয় গণমাধ্যমটি।
স্টেটসম্যান বলছে, মানবিক সহায়তার বার্তা সামনে এলেও টিকার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগেও বিতর্ক হয়েছে। সংস্থাটির বিরুদ্ধে অতীতে উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে পরোক্ষ সহায়তার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তুরস্ক সরকার তা অস্বীকার করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ানের ছেলের এই সফর শুধু মানবিক বা সাংস্কৃতিক নয়; এর কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। এখন তারেক রহমানের সরকার কোন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে।
প্রকাশ্যে সরকার প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দিলেও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তুরস্কের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের এই ‘নীরব’ সফর আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা এক প্রতিবেদনে বলেছে, টিকার চেয়ারম্যান আরন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘বিতর্কিত চরিত্র’। এমনিতে দেশে-বিদেশে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা পাঠানো টিকার কাজ। তবে সেই সাহায্যের আড়ালে একাধিকবার এই সংস্থার বিরুদ্ধে উগ্র ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্য করার অভিযোগ উঠেছে। কোন সংগঠনকে কখন, কীভাবে সাহায্য করেছিল টিকা, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেনি পত্রিকাটি।
এই গণমাধ্যমটির প্রশ্ন, এমন এক বিতর্কিত সংস্থার চেয়ারম্যান কেন ঢাকায় এলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্টের পুত্রই বা সেখানে কী করছেন, কেন এই সফরের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল, প্রশ্ন উঠেছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছিল।
এদিকে সুখবর ডটকমের পক্ষে খোঁজ নিলে জানা যায়, জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী সাবেক তারকা ফুটবলার মেসুত ওজিল এখন কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। তার সঙ্গে রয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান।
রিয়াল মাদ্রিদ ও আর্সেনালের সাবেক ফুটবলার মেসুত ওজিল ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী জার্মানি দলের সদস্য ছিলেন। ২০১৮ সালে জাতীয় দলকে বিদায় বলে দেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ওজিল খেলেছেন ৬৪৫ ম্যাচ, গোল করেছেন ১১৪টি।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে নেকমোদ্দিন এরদোয়ানের নেতৃত্বে ওজিলসহ একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আসেন। তারকা এই ফুটবলারকে পেয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত রোহিঙ্গা তরুণেরা। অনেকে সেলফি তুলেছেন তার সঙ্গে। নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে দূর থেকে ওজিলকে একনজর দেখেছেন অনেকে।
আজ সারাদিনই আশ্রয়শিবিরে ব্যস্ত সফরসূচি রয়েছে ওজিলদের। রোহিঙ্গা নারী, শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয় নিয়ে কথা বলেন তারা। ঘুরে দেখেন রোহিঙ্গা শিশুদের কয়েকটি স্কুল। সন্ধ্যায় একটি রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে সারে ইফতার।
আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা থেকে বিশেষ উড়োজাহাজে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি। বিমানবন্দরে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের স্বাগত জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছার পর প্রতিনিধিদলের সদস্যরা যান শহরের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে। সেখানে তাদের স্বাগত জানান আরআরআরসি ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত প্রায় ৪০ মিনিটের বৈঠক শেষ করে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সড়ক পথে ৪০ কিলোমিটার দূরের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের উদ্দেশে রওনা দেন।
বৈঠকে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ানকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
এই প্রসঙ্গে আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সরকার খুবই আন্তরিক, এই কথা প্রতিনিধিদলকে তুলে ধরেছি। পাশাপাশি আশ্রয়শিবিরে বন্ধ রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুলগুলো পুনরায় চালু করতে তুরস্ক সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। নেকমোদ্দিন এরদোয়ান বন্ধ শিক্ষাকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে আশ্বাস দিয়েছেন।’
মিজানুর রহমান আরও বলেন, উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে তুরস্ক সরকারে অর্থায়নের বর্তমানে ৯টি স্কুল চালু রয়েছে। আরও স্কুল চালু করা দরকার। দাতাগোষ্ঠীর অর্থসহায়তা বন্ধ থাকায় কয়েক মাস ধরে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে অন্তত দুই হাজার লার্নিংসেন্টার (শিশুশিক্ষাকেন্দ্র) বন্ধ রয়েছে। জাতিসংঘের ইউনিসেফের অর্থায়নে চালু আছে দুই হাজারের বেশি শিক্ষাকেন্দ্র।
আশ্রয়শিবিরে আরআরআরসি কার্যালয়ে বৈঠক শেষে কথা বলেন নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক সরকার রোহিঙ্গাদের পাশে ছিল এবং আছে। আমার মা-বাবাও রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’
কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, তুরস্কে প্রথম রোজার ইফতার অসহায় মানুষের সঙ্গে করার রেওয়াজ রয়েছে। সে হিসেবে নেকমোদ্দিন এরদোয়ান ও বিশ্বখ্যাত তারকা ফুটবলার মেসুত ওজিল রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে আজ প্রথম রোজার ইফতার সারলেন।
খবরটি শেয়ার করুন