ছবি: সংগৃহীত
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গাজী নাসিরউদ্দিন আহমেদের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্ট্যাটাসটিতে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ও তার বাবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত মুসা বিন শমসের সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য ও অভিযোগ উত্থাপন করেন। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (২৯ মে) রাত ১২টার পর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে গাজী নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুসা বিন শমসেরকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গাড়িতে চলাফেরা করতে দেখেছেন—এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে তিনি তথ্য পেয়েছেন। তবে তিনি ওই প্রত্যক্ষদর্শীর নাম প্রকাশ করেননি।
একই স্ট্যাটাসে তিনি বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের ব্যবসায়িক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসার শুরুর দিকের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন মুসা বিন শমসের। পাশাপাশি আশির দশকে তাকে অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হতো বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করে ববি হাজ্জাজের দেওয়া একটি বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রী পরে জানান, তিনি নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করছেন। এর মাধ্যমে এ বিষয়ে আর কোনো বিতর্ক বা ভুল–বোঝাবুঝি থাকবে না বলে তিনি মনে করেন।
শুক্রবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। নেটিজেনদের ধারণা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে ববি হাজ্জাজের ওই বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে সাংবাদিক গাজী নাসিরউদ্দিন আহমেদ তার এবং তার বাবা মুসা বিন শমসের-এর সমালোচনা করেন। নাসিরউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।
স্ট্যাটাসে গাজী নাসিরউদ্দিন আরও উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) গিয়ে মুসা বিন শমসের সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, সুইস ব্যাংকে তার বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে এবং সেই অর্থ দেশে আনতে পারলে তিনি নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারবেন। তিনি বলেন, সে সময় মুসা বিন শমসের আর্থিক সংকটে ছিলেন এবং নিজের বাড়ি বিক্রির চেষ্টাও করেছিলেন।
ববি হাজ্জাজকে নিয়েও স্ট্যাটাসে কঠোর সমালোচনা করেন গাজী নাসিরউদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের যে অভিযোগ একসময় আলোচনায় আসে, সেই অভিযোগ প্রচারে ববি হাজ্জাজ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ববি হাজ্জাজ জাতীয় পার্টি করতেন। শ্বশুরকূল ছাড়া তার নিজস্ব পরিচয় খুবই নাজুক। একজন যুদ্ধাপরাধীর সন্তান হওয়ার বেদনার ভার তার চিন্তাবিকৃতির কারণ হতে পারে।
স্ট্যাটাসটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেক ব্যবহারকারী সাংবাদিকের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন, আবার কেউ কেউ অভিযোগগুলোর প্রমাণ ও তথ্যসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ঢাকার বাসিন্দা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মাহির রহমান নামের একজন মন্তব্য করেন, “যদি এমন গুরুতর অভিযোগ আনা হয়, তাহলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি ও তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন। শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা শোনা কথার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।”
অন্যদিকে চট্টগ্রামের বাসিন্দা নাবিলা সুলতানা লিখেছেন, “দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে অতীতের নানা বিতর্ক রয়েছে। সেসব বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হওয়া দরকার, যাতে মানুষ সত্যটা জানতে পারে।”
উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল। বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠনটি অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান রক্ষায় কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সাদা দল এ দাবি জানায়।
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমি তো বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টার। আজকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি যে পরিমাণ গবেষণা করে, তার কানাকড়িও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করে না।’
এই মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ববি হাজ্জাজ। তিনি দাবি করেছেন, তার বক্তব্যের কিছু অংশ ভুলভাবে বোঝা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তার ভুল ব্যাখ্যাও করা হয়েছে।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে পরিচিত মুসা বিন শমসেরকে ২০১৪ সালের ২৮ জুলাই বিটিভিতে ‘কৃতী বাঙালি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সে সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার ৫৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দৈনিক প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের ব্যক্তিকে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও কথিত চিহ্নিতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনে একজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উঠে আসায় বিষয়টি হিমঘরে চলে যায়। মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে শুধু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে বিটিভির তৎকালীন মহাপরিচালক দাবি করেছিলেন, মুসা বিন শমসেরকে বিটিভিতে ‘কৃতী বাঙালি’ হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টি তার জানা ছিল না।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন ঢাকা-১৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ।
খবরটি শেয়ার করুন