ছবি: সংগৃহীত
দেশের টেলিভিশন টকশোগুলোর পরিচিত মুখ, সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি হঠাৎ করেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আর কোনো টেলিভিশন টকশোতে অংশ নেবেন না। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আল বিদা টকশো। অনিবার্য কারণবশত আজ থেকে কোনো টিভি টকশোতে যাবো না। শুধু আমার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে কথা বলবো ইনশা আল্লাহ।’
মাত্র দুটি বাক্যের এই ঘোষণাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের রাজনৈতিক টকশোতে গোলাম মাওলা রনি ছিলেন অন্যতম পরিচিত ও আলোচিত মুখ। জাতীয় রাজনীতি, নির্বাচন, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি কিংবা সমসাময়িক সংকট—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেই তার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। ফলে তার আকস্মিক বিদায়ের ঘোষণা শুধু দর্শকদের নয়, টেলিভিশন অঙ্গনেও কৌতূহল তৈরি করেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে তার পোস্টে ব্যবহৃত একটি শব্দগুচ্ছ—‘অনিবার্য কারণবশত’। ঠিক কী সেই অনিবার্য কারণ, সেটি তিনি ব্যাখ্যা করেননি। কোনো টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি গণমাধ্যমের পরিবর্তিত বাস্তবতা—এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রনিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
গোলাম মাওলা রনির ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের প্রচলিত টেলিভিশন টকশোগুলোর দর্শকসংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। একসময় রাতের টকশো ছিল রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিশ্লেষণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউটিউব, ফেসবুক লাইভ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থানে দর্শকের একটি বড় অংশ অনলাইনভিত্তিক আলোচনায় ঝুঁকেছে। অনেক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক ইতোমধ্যে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলে সেখানে নিয়মিত মতামত প্রকাশ করছেন।
রনির ঘোষণাতেও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে শুধু নিজের ইউটিউব চ্যানেলেই কথা বলবেন। অর্থাৎ, প্রচলিত সম্প্রচারমাধ্যমের পরিবর্তে তিনি সরাসরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বক্তব্য প্রকাশে তুলনামূলক স্বাধীনতা পাওয়া যায়, অন্যদিকে দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও সম্ভব হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ঘোষণার পরপরই নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ এটিকে দেশের টেলিভিশন বিতর্কের জন্য ক্ষতি হিসেবে দেখছেন।
ফেসবুকে আরিফুল ইসলাম নামে একজন লিখেছেন, “টেলিভিশনের চেয়ে এখন ইউটিউবের দর্শক অনেক বেশি। আপনি যদি স্বাধীনভাবে কথা বলতে চান, তাহলে এটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।” অন্যদিকে সাবিহা নাসরিন মন্তব্য করেছেন, “আপনার বক্তব্যের সঙ্গে সব সময় একমত হইনি। কিন্তু টকশোতে আপনার উপস্থিতি আলোচনা প্রাণবন্ত করত। সেই জায়গাটা হয়তো এখন শূন্য লাগবে।”
মো. ফাহিম রেজা নামে আরেকজন লিখেছেন, “শুধু ‘অনিবার্য কারণ’ লিখে চলে গেলে তো কৌতূহল থেকেই যায়। মানুষ জানতে চাইবে আসল কারণ কী।” আবার তানভীর আহমেদ নামের এক নেটিজেনের মন্তব্য, “এখন অনেকেই টেলিভিশনের চেয়ে নিজের প্ল্যাটফর্মে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ সেখানে সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই, সম্পাদনার চাপও কম।”
মেহজাবিন সুলতানা লিখেছেন, “আপনি ইউটিউবে থাকুন, কিন্তু টকশো পুরোপুরি ছেড়ে দেবেন না। ভিন্নমতের আলোচনা কমে গেলে গণতান্ত্রিক বিতর্কও দুর্বল হয়।”
অন্যদিকে কিছু ব্যবহারকারী এ ঘোষণার পেছনে রাজনৈতিক বা পেশাগত কোনো কারণ আছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন। যদিও এসব মন্তব্যের পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে সেগুলো আপাতত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জল্পনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
গোলাম মাওলা রনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত একটি নাম। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে প্রকাশ্যে মতামত দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে টেলিভিশন টকশোগুলোতে তার বক্তব্য অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সমর্থকরা তার স্পষ্টভাষিতার প্রশংসা করেন, আবার সমালোচকেরা তার কিছু বক্তব্যকে বিতর্কিত বলেও অভিহিত করেছেন। তবু টেলিভিশনের রাজনৈতিক আলোচনায় তিনি ছিলেন এমন একজন বক্তা, যার উপস্থিতি দর্শকের আগ্রহ তৈরি করত।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের একটি অংশ ধীরে ধীরে নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছেন। সেখানে তারা নিজেদের সময় অনুযায়ী দীর্ঘ আলোচনা করতে পারেন, দর্শকদের মন্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পান এবং প্রচলিত সম্প্রচার কাঠামোর বাইরে থেকে কনটেন্ট প্রকাশ করতে পারেন। ফলে টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।
তবে টেলিভিশন টকশোর গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমনটি মনে করেন না অনেক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক। তাদের মতে, টেলিভিশনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, যেখানে একাধিক পক্ষের অংশগ্রহণে সরাসরি বিতর্কের সুযোগ থাকে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেল মূলত একমুখী মত প্রকাশের ক্ষেত্র। তাই দুটি মাধ্যমের চরিত্র ও প্রভাব এক নয়।
গোলাম মাওলা রনির ঘোষণার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এটি কি সাময়িক বিরতি, নাকি স্থায়ী সিদ্ধান্ত? তিনি ভবিষ্যতে মত পরিবর্তন করবেন কি না, কিংবা ‘অনিবার্য কারণ’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন কি না—সেসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
তবে এটুকু স্পষ্ট, একটি সংক্ষিপ্ত ফেসবুক পোস্টই আবারও দেখিয়ে দিল, দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। টেলিভিশনের স্টুডিও থেকে ইউটিউবের ক্যামেরার সামনে—আলোচনার মঞ্চ বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে দর্শকের অভ্যাসও। সেই পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়ে গোলাম মাওলা রনির এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে থাকবে।
খবরটি শেয়ার করুন