ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) রূপা হক বলছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি- 'দুই পক্ষই খারাপ' ধরনের বিরক্তি যদি সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত, তাহলে সদ্য নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত ইসলামি আদর্শভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় সাফল্য পেতে পারত। দলটি কোনো নারী প্রার্থীকে সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি। শেষ পর্যন্ত আগের বিরোধী দল বিএনপি (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি) নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পায়।
তার দাবি, বাংলাদেশের এখনকার সময়টি নতুন করে শুরু করার সুযোগ হতে পারত। পুরোনো দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ ছিল। কিন্তু বেশি আশাবাদী হওয়া বোধ হয় ঠিক হবে না। (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান এখন দলের উত্তরসূরি। ১৭ বছর ইংল্যান্ডের কিংস্টনে নির্বাসনে থাকার পর তিনি দেশে ফিরেছেন। শেখ হাসিনার আমলে তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনকে শেখ হাসিনা এক অডিও বার্তায় ‘একতরফা প্রহসন’ বলেছেন এবং ইউনূস সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সাংবিধানিক সংস্কারের গণভোটও যুক্ত করা হয়। তবে সমালোচকেরা এটিকে ‘হয় সব বা না হয় কিছুই নয়’ ধরনের কঠোর ভোট বলে আখ্যা দিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের আমলে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে রূপা হক বলেন, প্রতিশোধের রাজনীতি এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার স্মৃতি—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এগুলো দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
তিনি বলেন, তরুণেরাই তথাকথিত ‘বাংলাদেশ–২.০’-এর সূচনা করেছিল। তাদের সংগ্রাম যদি কেবল পুরোনো ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তবে তা দুঃখজনক হবে। নতুন গঠিত ছাত্রদল এনসিপি নিয়ে শুরুতে উচ্ছ্বাস ছিল। কিন্তু তারা আশ্চর্যজনকভাবে আগে নিষিদ্ধ থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রূপা হক দ্য টেলিগ্রাফে লেখা এক বিশেষ নিবন্ধে এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ শনিবার (১৪ই ফেব্রুয়ারি) 'বাংলাদেশ নিডস অ্যা নিউ স্টার্ট–বাট উইল গেট ইট ওয়ান?' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
রূপা হক লেখেন, কিছুদিন আগে আমার কর্মস্থলে এক সহকর্মী বললেন, ‘তোমার জেনে ভালো লাগবে যে, আমি প্রবাসী ভোটটা দিয়ে দিয়েছি।’ ২০২৪ সালে ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশে এই প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ওই আন্দোলনে শত শত শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক আলাপ থেকে জানলাম, আমার সেই সহকর্মীর শিকড়ও আমার মতোই একই ভূখণ্ডে—বাংলাদেশে।
তিনি বলেন, আমি জানতে চাইলাম, ‘কাকে ভোট দিয়েছেন?’ তিনি বলেন, ‘জামায়াত।’ আমি পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম, ‘ইসলামপন্থীরা?’ তিনি যুক্তি দিলেন, ‘একবার ওদেরও সুযোগ দিয়ে দেখা যাক।’ তবে একজন ব্যক্তির মতামত কখনোই পরিসংখ্যানগতভাবে যথেষ্ট নয়।
তিনি জানান, এর আগে, ২০১৭ সালে আমি ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। তখন আমরা দুজনের সঙ্গেই দেখা করি। শেখ হাসিনা তখন ক্ষমতায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তার দল আওয়ামী লীগ সংসদের ৯০ শতাংশ আসন দখলে রেখেছিল। অন্যদিকে খালেদা জিয়া ছিলেন দুর্বল ও গৃহবন্দী অবস্থায়। তার দল বিএনপি আসন্ন নির্বাচন বর্জন করেছিল। অভিযোগ, ভোটে কারচুপি হবে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ছাত্রদের পছন্দের ব্যক্তি, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই দায়িত্ব নেন। নির্বাচনের সঙ্গে সাংবিধানিক সংস্কারের গণভোটও যুক্ত করা হয়। তবে সমালোচকেরা এটিকে ‘হয় সব বা না হয় কিছুই নয়’ ধরনের কঠোর ভোট বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি লেখেন, ১৯৮১ সালে স্বামী, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব নেন। শেখ হাসিনাও তার পিতা, দেশের প্রথম নেতা, ১৯৭৫ সালে নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পান। পরে তার দল টানা তিন মেয়াদ ক্ষমতায় ছিল।
তিনি বলেন, পঞ্চাশ বছরের কিছু বেশি সময়ের ইতিহাসে বাংলাদেশ বহু রক্তপাত দেখেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর ভেঙে পড়া তৈরি পোশাক কারখানার দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের চেষ্টা চলছিল। কিন্তু জোরপূর্বক গুম, সাজানো নির্বাচন, সামরিক শাসন, হত্যাকাণ্ড ও অভ্যুত্থান যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে ওঠে।
রূপা হক নিবন্ধে বলেন, একটি ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে শেখ হাসিনা যখন ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা’ বাতিল করেন। আগে নিরপেক্ষ বিচারকেরা নির্বাচন তদারক করতেন। কারণ দুই পক্ষ ও দুই পরিবারের মধ্যে অবিশ্বাস ছিল তীব্র। যখন যে পক্ষ এগিয়ে থাকে, তারা অন্য পক্ষকে দুর্নীতির অভিযোগে নিষিদ্ধ বা কারাবন্দী করে। এরপর বিরোধীরা ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে। একই চক্র বারবার ঘুরে ফিরে আসে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাজতন্ত্র নেই, বংশগত পদও নেই। তবু রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারকেন্দ্রিক। এই অবস্থা বদলাতে নতুন ও সতেজ শক্তির প্রয়োজন। দেখা যাক, এই তরুণ দেশের জন্য এটি সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা হয় কি না, নাকি পুরোনো অভ্যাসই আবার জিতে যায়।
খবরটি শেয়ার করুন