মঙ্গলবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার ঘোষণা *** গবেষণা ও জনমত যাচাই ছাড়া পুলিশের পোশাক পরিবর্তন পুনর্বিবেচনার আহ্বান *** আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ‘রাজসাক্ষী’ বানিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ *** ‘চেতনা পরিপন্থি হলে তো সংবিধান পরিপন্থি হয় না’ *** নিজের ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম ডিঅ্যাকটিভেট করলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব *** রাষ্ট্রপতিকে রক্ষায় বিএনপি কেন অনড় ছিল, দলটির বিষয়ে কি বলছেন তিনি? *** ‘বিএনপির শক্ত অবস্থানের কারণেই সাহাবুদ্দিন থেকে গেছেন বঙ্গভবনে’ *** সদ্য সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ৯ হাজার কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ *** বিদ্যুতে বকেয়া ৪৫ হাজার কোটি টাকা, মন্ত্রী বলছেন—দেউলিয়া পরিস্থিতি *** ১২ই মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন ডেকেছেন রাষ্ট্রপতি

ফিলিস্তিন ইস্যু পেছনে ফেলে যেভাবে গড়ে ওঠে ভারত-ইসরায়েল সখ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

🕒 প্রকাশ: ১০:২৪ পূর্বাহ্ন, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবের বাইরে অবস্থিত বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে প্রথমবারের মতো অবতরণ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রানওয়েতে বিছানো লাল গালিচার অপর প্রান্তে তাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সময়টা ছিল ২০১৭ সালের ৪ঠা জুলাই।

কয়েক মিনিট পরই দুই নেতার করা আলিঙ্গন দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিমানবন্দরে বক্তব্যকালে সফরটিকে ‘পথপ্রদর্শক যাত্রা’ বলে আখ্যায়িত করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কারণ, এটিই ছিল ভারতীয় কোনো প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরায়েল সফর। খবর আল জাজিরার।

আর নেতানিয়াহু স্মরণ করেন ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে তাদের প্রথম সাক্ষাতের কথা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম সাক্ষাতে দুই নেতা ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যকার ‘অবশিষ্ট দেয়াল ভেঙে ফেলার’ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালের মোদির ইসরায়েল সফর সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ ঘটনার নয় বছর পর আগামীকাল বুধবার (২৫শে ফেব্রুয়ারি) দ্বিতীয়বারের মতো ইসরায়েল সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ‘দেয়াল ভাঙার’ যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে তিনি অনেকটাই সফল হয়েছেন। এক সময় ভারতে যে সম্পর্ককে নেতিবাচক মনে করে গোপনে পরিচালিত হতো, তা এখন নয়াদিল্লির অন্যতম প্রকাশ্য কূটনৈতিক বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে।

গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। সেসব উপেক্ষা করে বহুবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মোদি।

ভারতীয় কূটনীতিক ও কর্মকর্তারা ইসরায়েলের দিকে ঝোঁককে ‘বাস্তববাদী কৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তাদের যুক্তি, প্রযুক্তি ও সামরিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ ইসরায়েলকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে আরব মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার রাখার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ নীতিগত পরিবর্তনের মূল্যও দিতে হয়েছে। ক্ষুণ্ন হয়েছে ভারতের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক পলিসি পারস্পেকটিভস ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো আনোয়ার আলম বলেন, ‘গ্লোবাল সাউথে ভারতের যে নৈতিক শক্তি ছিল তথাকথিত বাস্তববাদী মোড় তা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

উপনিবেশ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় ভারত ছিল ফিলিস্তিনের দৃঢ় সমর্থক। স্বাধীনতার পরপরই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেন দেশটির শীর্ষ নেতারা। ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিন বিভাজনে জাতিসংঘের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে ভারত। চার দশক পর, ১৯৮৮ সালে, প্রথম অ-আরব দেশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় দেশটি।

তবে শীতল যুদ্ধের অবসান নয়াদিল্লির কৌশলগত অবস্থান বদলে দিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে জোটনিরপেক্ষ থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে থাকা ভারত নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে।

এর পাশাপাশি ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে নয়াদিল্লি। এরপর থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসা ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের বড় অনুঘটক। তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ ভারতকে হিন্দুদের প্রাকৃতিক আবাসভূমি হিসেবে দেখে। যা ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্র ধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

মোদির আমলে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতায় পরিণত হয়েছে ভারত। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ভারতীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ইসরায়েলে বিপুল রকেট ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে।

সাম্প্রতিক সফরের আগে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো গভীর করতে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। যৌথভাবে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা চলছে। এছাড়া, জেরুজালেমে কনেসেটে মোদির ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ম্যাক্স রোডেনবেক বলেন, ‘বিজেপি আমলে প্রকাশ্য প্রো-ইসরায়েল নীতির যে রূপান্তর, মোদির ভাষণ সেটির গুরুত্ব তুলে ধরবে।’

তার মতে, ইসরায়েলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তি জোরদারেও এ সফর সহায়ক হতে পারে।

২০১৭ সালে মোদির ইসরায়েল সফর ছিল মোড় ঘোরানো। এর আগে ভারতীয় নেতারা ইসরায়েল সফর করলে ফিলিস্তিন সফরও যুক্ত করতেন। মোদি সেই প্রথা ভেঙে ২০১৭ সালে শুধু ইসরায়েল যান; পরের বছর ফিলিস্তিন সফর করেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৭ সালের সফর নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত ইমেইলে দেখা যায়, যৌন অপরাধে দণ্ডিত ধনকুবের জেফরি এপস্টেইন দাবি করেছিলেন, ইসরায়েল সফর ঘিরে মোদি তার পরামর্শ নিয়েছিলেন। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব দাবি উড়িয়ে দিয়েছে।

বিতর্ক থাকলেও সফরটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে বেগবান করেছে। ১৯৯২ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল ২০ কোটি ডলারের আর ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া, গত বছরও দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি সই করেছে; আলোচনা চলছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও।

গাজা যুদ্ধের পর গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ ইসরায়েল সফর এড়িয়ে গেলেও মোদির সফর তাৎপর্যপূর্ণ। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের কবীর তানেজা বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইসরায়েলের খুব বেশি বন্ধু নেই; ভারত সেই ভূমিকা পালন করছে।’

তার মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত ও ইসরায়েলের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। হামাস-নেতৃত্বাধীন ৭ই অক্টোবরের হামলার নিন্দা জানানো বিশ্বনেতাদের মধ্যে মোদি ছিলেন প্রথম সারিতে; একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে পুরোপুরি সরে আসেনি। ভারত এখনো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ও সংলাপের মাধ্যমে শান্তির আহ্বান জানায়। তবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে সমালোচনায় ক্রমেই সংযত অবস্থান নিচ্ছে দিল্লি।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে ইরান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ করেছে ভারত। সেই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ গুটিয়ে নেয়ার পদক্ষেপও নিয়েছে। এ বন্দরকে স্থলবেষ্টিত মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানে প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখত নয়াদিল্লি।

জে.এস/

ভারত-ইসরায়েল

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250