সোমবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘বিএনপির শক্ত অবস্থানের কারণেই সাহাবুদ্দিন থেকে গেছেন বঙ্গভবনে’ *** সদ্য সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ৯ হাজার কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ *** বিদ্যুতে বকেয়া ৪৫ হাজার কোটি টাকা, মন্ত্রী বলছেন—দেউলিয়া পরিস্থিতি *** ১২ই মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন ডেকেছেন রাষ্ট্রপতি *** ৫ই আগস্টের পরের মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** বিএনপির যে নেতাদের ৬ সিটিতে প্রশাসক করল সরকার *** বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনার প্রত্যাশায় ইইউ *** ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র নির্বাচন করবেন ইশরাক হোসেন *** লাইনে দাঁড়ানো মুসলিম নারীদের কম্বল দিলেন না বিজেপি নেতা *** ম্যাচ পরবর্তী আচরণের জন্য শাস্তি পাচ্ছেন না মেসি

‘বিএনপির শক্ত অবস্থানের কারণেই সাহাবুদ্দিন থেকে গেছেন বঙ্গভবনে’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৫০ অপরাহ্ন, ২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আড়াই মাসের মাথায় ১৯শে অক্টোবর দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন; কিন্তু তার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।

এই কথোপকথন পত্রিকাটির রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘জনতার চোখ’-এ প্রকাশিত হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে ও বাইরে সরব হয় ওঠে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন না চাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমপক্ষে দুই দফায় রাষ্ট্রপতির অপসারণ কিংবা পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও কিংবা বড় ধরনের চাপ তৈরি করা হলেও মো. সাহাবুদ্দিন থেকে গেছেন বঙ্গভবনেই। 

তখন উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ওই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান কয়েক উপদেষ্টা। তারা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ করে একজন বিচারপতিকে বসিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা করেন। রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ বা অভিশংসন করার ক্ষমতা একমাত্র জাতীয় সংসদের রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংসদ ছিল না; কিন্তু তখন অনেক কিছু আইনের বাইরে হয়। সরকার তাই চাইলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের ব্যবস্থা নিতে পারে বলে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে মতামত দেন ওই সময়ের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন।

রাষ্ট্রপতিকে আসিফ নজরুলদের অপসারণের পরিকল্পনা সফল হতে দেয়নি বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনার মধ্যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের তিনজন নেতা ২০২৪ সালের ২৩শে অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে এই বিষয়ে তাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অবস্থান জানান।

তারা বলেন, এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে দেশে কোনো ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা বা অস্থিরতা তৈরি হোক, দলটি তা চায় না। সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন কঠিন সময় পার করার কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিন।

তিনি বলেছেন, সদ্য বিদায়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যেমন তাকে অপসারণের চেষ্টা চালিয়েছে, তেমনই বিদেশ সফর আটকানো, কূটনৈতিক মিশন থেকে ছবি নামিয়ে ফেলা, প্রেস উইংকে অপসারণের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে।

গত শুক্রবার রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপ্রধান। আজ সোমবার (২৩শে ফেব্রুয়ারি) পত্রিকাটি সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপপু নামে চিনত।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে।

শেখ হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মতো বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে শপথ নিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা ‘চক্রান্ত’ হয়েছে দাবি করে মো. সাহাবুদ্দিন সাক্ষাৎকারে বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ‘চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা’ হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। একই সঙ্গে বিদেশ সফরের পর নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে সফর বা চুক্তির বিষয়ে অবহিত না করার অভিযোগ করেছেন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে।

কালের কণ্ঠ কেমন আছেন জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সপ্তাহখানেক ধরে ভালো আছি বেশ।’ অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর বঙ্গভবনে কেমন কেটেছে— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই দেড় বছর আমি কোনো আলোচনায় নেই অথচ আমাকে নিয়ে চলে নানা চক্রান্ত। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভালো, তা বলা যাবে না। আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এ রকম ঝড় সহ্য করার মতো ক্ষমতা অন্য কারো ছিল কি না আমি জানি না।’

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ‘এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে আসে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও একটা সিদ্ধান্তে এসেছিল। সেটা হলো, যদি রাজনৈতিক দলগুলো চায় আমি অপসারিত হই, তাহলেই শুধু আমি অপসারিত হতে পারি; নচেৎ নয়। পরে দেখা গেল যে এই ইস্যুতে দুটি গ্রুপ হয়ে গেল।’

তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে সমর্থন পাওয়ার কথা জানিয়ে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছে। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে আরেকবার আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। তখনো তিন বাহিনীর প্রধানরা আমার পক্ষে অবস্থান নেন। বঙ্গভবনের সামনে যখন মব সৃষ্টি করা হয়, তখনো সশস্ত্র বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সবশেষ চুক্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘না, কোনো কিছুই আমি জানি না। এ রকম রাষ্ট্রীয় একটা চুক্তি অবশ্যই আমাকে জানানো দরকার ছিল। এটা ছোটখাটো হোক আর বড় কিছু হোক, অবশ্যই পূর্ববর্তী সরকারপ্রধানরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। আর এটি হলো সাংবিধানিক একটা বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি তো তা করেননি।’

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘উনি যে প্রধান উপদেষ্টা হলেন, সেই প্রক্রিয়ার উৎসই ছিলাম আমি। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা পরবর্তী সময়ে আমার সঙ্গে সেভাবে সমন্বয় করেননি। এটি আসলে বোঝানোর কোনো উপায়ও নেই। কেননা তিনি একটিবারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আমার দুইবার বিদেশ সফর উনি আটকে দিয়েছেন।’

কেন বিদেশ সফরে যেতে দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই সরকার চায়নি কোথাও আমার নাম আসুক। আমাকে একদম অন্ধকারে ফেলে রাখার চেষ্টা করেছে। তারা চায়নি জনগণ আমাকে চিনুক, জানুক। এটি আমাকে খুবই কষ্ট দিয়েছে। শুধু বিদেশে নয়, দেশের কোনো অনুষ্ঠানেও আমাকে যেতে দেয়নি। বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির যাওয়ার কথা। সেটিও তারা আটকে দেয়।’

‘এক রাতের মধ্যে সারা পৃথিবীর সব হাইকমিশন থেকে আমার ছবি নামিয়ে দেওয়া হলো। দীর্ঘদিনের একটা রেওয়াজ রাতারাতি শেষ করে দেওয়া হলো। ওই ঘটনাটি গণমাধ্যমে এলে আমি জানতে পারি। তখন আমার মনে হয়েছে যে এটি বোধহয় আমাকে অপসারণের প্রথম ধাপ। সুতরাং পরবর্তী ধাপে হয়তো আমাকে সরিয়ে দেবে। এ জন্য আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।’

মো. সাহাবুদ্দিন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250